স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আফজাল হোসেন দুই শতাধিক কোটি টাকার মালিক হয়ে এখন কানাডায় অবস্থান করছেন। তিনি দেশে না থাকলেও অধিদপ্তর থেকে স্থানীয় প্রশাসন—সব জায়গাতেই দুর্নীতিবাজ আফজালদের প্রবল দাপট দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, তাদের খুঁটির জোর কোথায়?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আফজালদের কাছে আমরাও জিম্মি।’ কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, তাদের নেটওয়ার্ক মন্ত্রণালয় পর্যন্ত রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে এই আফজাল গ্রুপের সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে প্রকাশ্যে দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ের অপর একজন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, মন্ত্রণালয়েও রয়েছে এ ধরনের আফজালরা। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতেও রয়েছে আফজালদের দৌরাত্ম্য। স্থানীয় প্রশাসন পারছে না তাদের ওপর লাগাম টেনে ধরতে।
আফজাল হোসেনের তথ্য বেরিয়ে আসার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি চক্র ভাঙতে সুপারিশ করেছিল দুদক। একই সঙ্গে অধিদপ্তরের ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছিল দুদক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেন ও তার স্ত্রী একই অধিদপ্তরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার স্টেনোগ্রাফার রুবিনা খানম। আফজালকে বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিত্সাসেবা, চিকিত্সাসেবায় ব্যবহূত যন্ত্রপাতি, ওষুধ সরবরাহসহ ১১টি খাতে দুর্নীতি বেশি হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনে দুর্নীতির এই খাতগুলো চিহ্নিত করা হয়। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করে সংস্থাটি। কিন্তু এক বছর পার হয়ে গেলেও কোনোভাবেই আফজালদের দমানো যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা এসব স্বীকার করে বলেন, আফজালদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আর ব্যবস্থা নিতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়। তাদের কাছে অনেকটা অসহায় স্বাস্থ্য প্রশাসন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করে দুর্নীতিবাজাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে কোনো দুর্নীতি ও অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।
অনেক সেক্টরের মতো নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে ইতিমধ্যে বদলি হয়ে আসেন কোটি কোটি টাকার দুর্নীতিতে অভিযুক্ত আফজাল মার্কা এক কর্মকর্তা। এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলম আরা বেগমকে বদলি করার পরদিন থেকে ঐ আফজাল মার্কা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাসহ অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, নীতি-আদর্শগতভাবে বদলির আদেশ হওয়ার পর এ ধরনের ঢালাও বদলি পদায়ন করা সত্ কর্মকর্তার কাজ নয়। নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া এই মহাপরিচালক নার্সিং অধিদপ্তরে যোগদান করার পর সহস্রাধিক কর্মকর্তাসহ সিনিয়র স্টাফ নার্সদের বদলি করেছেন। এই বদলির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। কিন্তু এই কমিটিকে তোয়াক্কা না করে তিনি একাই বদলি শুরু করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে এই কমিটি ছাড়া কোনো বদলি করা হলে সেটি বৈধ হবে না। তিনি যোগদানের পর যে সহস্রাধিক বদলি করেছেন, সেগুলো বৈধ নয় বলে মন্ত্রণালয়ের ঐ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এই বদলির নেপথ্যে বিএনপি আমলের নার্স সংগঠনের একজন জামায়াত-শিবিরের নেতা রয়েছেন। তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এই বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এমনকি বঙ্গবন্ধুর ছবিকে অবমাননা করা নিয়ে যে তদন্ত কমিটি হয়েছে, ঐ কমিটিতে এই নেতা রয়েছেন। এই নেতা মহাপরিচালকের আস্থাভাজন ছিলেন। অবমাননার ঘটনা তদন্ত না করে নিউজটি কেন পত্রিকায় প্রকাশিত হলো, সে কারণে চার কর্মকর্তাকে চাকরি খাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন জামায়াত-শিবিরের ঐ নেতা। নার্সিং সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জামায়াত-শিবিরের এই নেতার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সহস্রাধিক নার্সকে বদলি এবং মহাপরিচালক বদলি আদেশের পর মাত্র চার কর্ম দিবসে আফজাল খ্যাত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাসহ অর্ধশতাধিক বদলি পদায়নের আদেশ বাতিল করার দাবি জানান। এই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আহ্বান জানান। মহাপরিচালকের বদলি প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বঙ্গবন্ধুর ছবি অবমাননার কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে তাকে বদলি করা হয়েছে।
