লড়াইটা ছিল অত্যন্ত স্নায়ুক্ষয়ী। অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে চারবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে পরাজিত করিয়া প্রথমবারের মতো শিরোপা অর্জন করিয়াছে বাংলাদেশের টিনএজার ক্রিকেটাররা। দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে ইহার চাইতে বড়ো সাফল্য আগে আর আসে নাই। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত সাফল্য বলিয়া দেয়, টিম স্পিরিট কী জিনিস, দলগতভাবে পারফরম করা কাহাকে বলে! উষ্ণ অভিনন্দন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের জন্য।
সাফল্য তো এমনি এমনি আসে না, ইহার নেপথ্যে থাকে কঠিন অধ্যবসায়, পরিশ্রম, দলগত প্রচেষ্টা এবং বুদ্ধিমত্তা। ফাইনালে টসে জিতিয়া প্রথমে বোলিং করিয়া ভারতকে বেশি দূর আগাইতে দেয় নাই শরিফুল ইসলাম, তানজিম হাসান সাকিব, রকিবুল হাসানরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে আগে ব্যাট করিয়া ১৭৭ রানে অলআউট হওয়া ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দল একপর্যায়ে বাংলাদেশকে আটকাইয়াছিল ৭ উইকেটে ১৪৩ রানে। তবে ইহার পরই শুরু হয় আকবর আলী আর রকিবুল হাসানের সাহসিকতা ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞার অনুপম ব্যাটিং। এই ম্যাচে আরো একটি প্রতিপক্ষ ছিল বৃষ্টি। সেই কারণে বৃষ্টি নামিলে কী হইবে, বৃষ্টি নামিলে কত স্কোর করিয়া রাখিয়া যাইতে হইবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকিবার জন্য, এমন হিসাব-নিকাশও জরুরি ছিল। এই ক্ষেত্রে প্রশংসা করিতেই হয় পারভেজ হোসেন এবং অধিনায়ক আকবর আলীর। আরো এক ধাপ আগাইয়া বলা যায়, অধিনায়ক আকবর এক অর্থে উদাহরণই গড়িয়াছেন দলের বিপদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ দিয়া। যখন বৃষ্টি আসিল তখন বৃষ্টি আইনে ১৬ রান আগাইয়া ছিল বাংলাদেশ। খেলা আর শুরু না হইলেও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হইবে—এমন সমীকরণ লইয়াই ড্রেসিংরুমে ফিরিয়াছিল বাংলাদেশ। এইদিকে বৃষ্টি থামিবার পর নূতন লক্ষ্যে বাংলাদেশের দরকার ৩০ বলে ৭। এবং সকল জটিলতার অবসান ঘটাইয়া বাংলাদেশ জয়ের তটে নোঙর করে মাথা ঠান্ডা রাখিয়াই।
যাহারা এই দলে খেলিয়াছেন, তাহারা সাফল্যের ব্যাপারে যেন ভীষণই ক্ষুধার্ত ছিলেন। আমরা দেখিয়াছি দুই বত্সর ধরিয়া দলের সকলেই একসঙ্গে ছিলেন। একজন আরেকজনকে জানা, যোগাযোগ রাখা, পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখা—তাহারই প্রতিফলন দেখা গিয়াছিল রবিবারের ফাইনালে। সুতরাং চমত্কার টিম স্পিরিট বিশ্বকাপ জয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশকে আগাইয়া রাখিয়াছিল। এই কারণে আমরা দেখিতেছি, ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ দল পিছাইয়া থাকিলেও দলীয় পরিসংখ্যানে ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই শীর্ষ দুইয়েই রহিয়াছে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ব্যাটিং গড় ৩৩.৬৮। শুধু রানার্সআপ ভারতই এই পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের উপরে। ক্রিকেট যে জেন্টেলম্যানদের খেলা, ইহার ছাপও পাওয়া যায় বাংলাদেশের অধিনায়ক আকবর আলীর আচরণে। কিছু উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তিনি যেইভাবে সামলাইলেন তাহাতে তাহার প্রশংসা করিতেই হয়।
বাংলাদেশের এই ক্রিকেটাররা আরো পরিণত হইয়াই সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে পা রাখিবে, বাংলাদেশের মুকুটে যুক্ত করিবে অভাবিত সকল পালক, ইহা আশা করা নিশ্চয়ই অতিরঞ্জিত হইবে না। ইহার ব্যত্যয় যাহাতে না ঘটে সেই জন্য কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ঘরোয়া ক্রিকেটের ভিতর দিয়া তাহাদের তৈরি করিয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে লইয়া যাইতে হইবে।
