কবীর চৌধুরী তন্ময়
বঞ্চিত, নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের মানবতার দূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘...সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না...।’ জাতির পিতার ওই উদ্যোমী বক্তব্য শুধু সাত কোটি মানুষকেই মন্ত্রমুগ্ধ করেনি, তিনি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের মরণ-পণ মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে সহায়তা করেছেন। শুধু তাই নয়, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও পাকিস্তানের বর্বরতা আর শোষণ, নির্যাতন ও শত্রুমুক্ত করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র বিশ্ব মানচিত্রে জন্মদিতে ৩০ লাখ তাজা প্রাণ তাদের বুকের লাল রক্ত এ দেশের সবুজ জমিনে ঢেলে দিয়েছে। ২ লাখেরও বেশি নারী সম্ভ্রম বিনাশের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানিদের পাশবিক অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ করেছে।
হ্যাঁ! আমরাই পারি। আমরাই বাঙালি। এই বাঙালিকে পারার মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ’৭৫ পরবর্তী সময় জুড়ে শুধু ‘আত্মবিশ্বাস’ আর ‘আমরাও করতে পারি’—সাহসটুকু একক চিত্তে আমাদের দিয়ে চলেছেন। শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবী জুড়ে একমাত্র শেখ হাসিনার মতো রাষ্ট্রনায়ক শত-সহস্র অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক মন্তব্য শুনেও ‘বাঙালি’ ও ‘বাংলাদেশ’র জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, শত্রুর ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে মৃত্যুর খুব নিকট থেকে ২৯ বার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন—আগামী প্রজন্মের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত অর্থনৈতিক মুক্তির বাংলাদেশ গড়তে।
ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ এক বারুদ। কাটার মাস্টার মুস্তাফিজ থেকে অলরাউন্ডার সাকিব—সবই বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বোলিংয়ে ছিল আগুন, ফিল্ডিংয়ে রীতিমতো বারুদ। লক্ষ্যটাও ছিল স্থির। ব্যাটিংয়ের শুরুটাও ছিল দারুণ। খেলার মাঠে নানা নাটকীয়তার মাঝে টাইগাররা একেবারে খাদের কিনারা থেকে যেন আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা—এক কথায় অসাধারণ। এই লড়াকু মানসিকতার সঙ্গে পেরে ওঠেনি ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দল। তাদের হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ।
৯ ফেব্রুয়ারি আমাদের জন্য সত্যিই একটি বড় দিন। এমন দিন কখনো আসেনি বাংলাদেশের ক্রিকেটে। অনুর্ধ-১৯ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ, গৌরবান্বিত হওয়ার কৃতিত্ব! ক্রিকেট উন্মাদনার এই রেকর্ড অর্জন আমাদের করতেই হবে, আমরা বাঙালি, আমরাই পারি—এই বিষয়গুলো প্রচণ্ডভাবে কাজ করেছে। চারবারের রেকর্ড ট্রফি জয়ী ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অভূতপূর্ব সাফল্যের দিন—আমাদের পারার দিন, আমাদের বাঙালির দিন।
অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের শিরোপাজয়ী বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মুজিববর্ষের প্রাক্কালে এই জয়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল, কোচ, ম্যানেজার এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই খেলোয়াড়ি মনোভাব ধরে রেখে এভাবেই ভবিষ্যতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
সাবেক ভারতীয় স্পিনার হরভজন এ আকর্ষণীয় ফাইনাল দেখে মুগ্ধ। বলেছেন, ‘অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দুর্দান্ত একটা ফাইনাল ছিল এটা। অভিনন্দন, বিসিবি টাইগারস বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য। টিম ইন্ডিয়ার চিন্তার কোনো কারণ নেই, তোমরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতোই খেলেছ।’
অন্যদিকে এ ট্রফি আকবরদের প্রাপ্য বললেন ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে, ‘এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য একটি বিশাল মুহূর্ত। আজ বাংলাদেশ যেভাবে খেলেছে তাতে ট্রফিটা তাদেরই প্রাপ্য।’
ভুলে যায়নি ভারত ক্রিকেট বোর্ডও। বিসিসিআই অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশকে, ‘ভালো লড়াই করেছ টিম ইন্ডিয়া। বিশ্বকাপের ফাইনালে দারুণ সমাপ্তি, অভিনন্দন বাংলাদেশ।’
আবার পাকিস্তানের অলরাউন্ডার শোয়েব মালিকও প্রশংসা করেছে। ‘অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বিজয়ী হওয়ার জন্য অনেক অভিনন্দন। আমি টুর্নামেন্টটি খুব কাছ থেকে দেখেছি এবং দেখে মনে হচ্ছে বিশ্বের অনেক তরুণ প্রতিভা এখান থেকে উঠে আসছে। তাদের অগ্রগতি দেখতে আমি উন্মুখ হয়ে আছি। তবে আপাতত ছেলেরা উদ্যাপন করুক’—বলে তিনি তার টুইট বার্তায় অভিনন্দন জানিয়েছেন। সঙ্গে যোগ হয়েছে পাকিস্তানের নারী দলের ক্রিকেটার সানা মীরও। বাংলাদেশের প্রশংসায় অভিনন্দন বার্তায় তুলে ধরেন, ‘বিশ্বকে শক্তিশালী বার্তা দিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দল।’
‘বিশ্বকাপ জেতার জন্য বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে অভিনন্দন। ক্রিকেটের জন্য অবশ্যই দুর্দান্ত কিছু করা উচিত’—বলে মন্তব্য করে ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ইরফান পাঠানও তার অভিনন্দন জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশি ক্রিকেট তারকা থেকে আরম্ভ করে ক্রিকেটভক্তকুল এই জয়ের আনন্দ নিয়ে ভাসছে। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, গবেষক ও সব শ্রেণিপেশার মানুষসহ সেই দূরের গ্রামের ছোট্ট কিশোরও বাংলাদেশের এই জয়ে নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি।
আমাদের আটকে রাখা সম্ভব নয়। আমরা দুর্দান্ত। আমরা উদ্যোমী। আমরা উড়ে যাব দেশ থেকে দেশান্তরে। আমরা জয় করব আমাদের স্বপ্নকে। আমাদের আগের নারী-পুরুষদের সর্বস্ব ত্যাগে অর্জিত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। মুক্তিযোদ্ধার বাংলাদেশ, আমাদের বাংলাদেশ নিয়ে আমরাই গর্ববোধ করব। কারণ, আমাদের আছে শেখ হাসিনার মতো ব্যক্তিত্ব। পিতার মতো নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিতেও তার ক্লান্তি নেই। বিশ্বনেতাদের সামনে সত্য ও সোজা কথা বলতে, মানুষ ও মানবতার স্লোগান ধরতে শেখ হাসিনাও এক দৃষ্টান্ত। আমরা তারই উত্তরসূরি।
পিতা মুজিব আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, বাঙালিরা বীরের জাতি। বাঙালিরা একত্রিত হয়ে সবকিছু জয় করতে পারে। যে বাঙালি তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে সমবেত হয়ে অধিকার অর্জন করতে পারে, যে জাতি সব অন্ধকারের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে পারে—এ জাতিকে কে দাবায়ে রাখার ক্ষমতা রাখে?
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপ জয়ের এই দিনে বঙ্গবন্ধুর বাঙালির ‘জয় বাংলা’র জয় হয়েছে, জয় হয়েছে আমাদের আত্মপ্রত্যয় ও সাহসের। এই প্রাপ্তি বাঙালি জাতিকে দিয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব বিজয়ের গৌরব। অভিনন্দন টাইগারস। অভিনন্দন বাংলাদেশ ক্রিকেট।
আসুন, আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে বাংলা মায়ের বিজয়ে সমঃস্বরে বাংলার জয়কে উপভোগ করি।
n লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)
