জানা-অজানা

কাগজ-কথা

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৩০

কুতুব আজাদ

বাংলায় প্রবাদ আছে—‘কালি কলম মন লেখে তিনজন’। পৃথিবীর উষালগ্নে এই তিনজনের লেখার জন্য কাগজ ছিল না। মানুষের কথা বলা শুরু ১,০০,০০০ বছর আগে। অন্যদিকে, মানুষ মাত্র ৫,০০০ বছর আগে লিখতে শিখেছে। আদি যুগে মানুষ বিভিন্ন উপায়ে মনের ভাব প্রকাশ করত। আভাসে-ইঙ্গিতে, লতায় গেরো দিয়ে, সুতায় মালা গেঁথে কিংবা কাঠে আঁচড় কেটে চলত মানুষে-মানুষে ভাবনার বিনিময় বা লেখার কাজ।

তারপর লেখার উপকরণ হিসেবে পাথরের ব্যবহার শুরু। কাঁচা ইট ও টালির ওপর লেখা শুকিয়ে পুড়িয়ে ‘কিউনিফর্ম বুক’ আর কাঠের ফলকে ‘কোডেক্স’ তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে কাগজের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ধাতু যথা—সোনা, রূপা, তামা, ব্রোঞ্জ ও পিতলে লেখার কাজ চলত। প্রাচীন যুগে লেখার উপকরণরূপে তুলা ও রেশমি কাপড়ের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়। এমনকি পার্চমেন্ট (মৃত পশুর চামড়া) ও পশুর চামড়াও ছিল লেখার আধার।

প্রকৃতিতে মিশে ছিল কাগজের উপকরণ। এক রকমের বোলতার চাককে গাছের মণ্ডের লালায় ভিজিয়ে কাগজ তৈরি করা হতো। তারপরে লম্বা আঁশের গাছ, ছেঁড়া চট, বাঁশ, ঘাস, জালি, তিসি, দড়ি ইত্যাদির মণ্ড থেকে বানানো হতো কাগজ।

১০৫ সালে চীনে প্রথম কাগজ তৈরি হয়। ৭৫১ সালে মধ্য এশিয়ায় এবং ৭৯৩ সালে বাগদাদে কাগজের প্রচলন ঘটে। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বিশেষত তুরস্ক, আরব, মিশর, মরক্কো এবং ইউরোপের স্পেন ও ইতালিতে কাগজের ব্যবহার দেখা যায়। ১৫ শতকের মধ্যভাগে ভারতের কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশে কাগজশিল্প গড়ে ওঠে। নেপাল, ত্রিপুরা ও ভারতের পূর্বাঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন পুঁথি ও দলিলপত্র থেকে ১২ ও ১৩ শতকের আগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কাগজের ব্যবহার অনুমান করা যায়।

১৮১২ সালে উইলিয়াম কেরী শ্রীরামপুরে প্রথম কাগজ তৈরির কারখানা (ছাপাখানা) প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর হাওড়ার বালিতে, বর্ধমানের নিরালা, মানদা, শাহবাজার, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, দিনাজপুর ও পাবনায় কাগজশিল্পের প্রসার ঘটে। ভারত ও চীনের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে বালিতে ‘রয়্যাল পেপার মিল’ (১৮৬৭), ‘চিটাগড় পেপার মিল’ (১৮৮২), রানিগঞ্জে ‘বেঙ্গল পেপার মিল’ (১৮৮৯), ‘বল্লারপুর  পেপার ও বোর্ডস কোম্পানি’ (১৯৪৫) এবং চন্দ্রহাটিতে ‘ত্রিবেণী টিসুস’ (১৯৪৬) গড়ে ওঠে।

প্রাচীন যুগে কাগজে উপদেশমূলক, নীতিকথাধর্মী ও পাঁচালি জাতীয় বিভিন্ন বই ছাপা হতো। বাংলা হরফে ছাপা প্রথম বই ‘ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড’-এর বাংলা ব্যাকরণ বই ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’।