ভয়াবহ সুনামির জন্য অতীতে ইন্দোনেশিয়া বারবার বিশ্বের গণমাধ্যমের শিরোনাম হইয়াছে। গত সেপ্টেম্বরের পর সর্বশেষ শনিবার রাতে ইন্দোনেশিয়ার সান্দা স্ট্রেইট উপকূলে আঘাত হানিয়াছে ভয়াবহ সুনামি। এই দুর্যোগে এখন অবধি নিহত হইয়াছেন ১৬৮ জন। গুরুতর আহত হইয়াছেন সাড়ে সাত শতাধিক। নিখোঁজের সংখ্যা ৩০। শনিবার রাত্রে প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে শত শত বাড়ি-ঘর ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। উপড়াইয়া পড়িয়াছে বহু গাছ। সুনামি সাধারণত সাগরের তলদেশে ভূমিকম্পের কারণে হইয়া থাকে। তবে ইন্দোনেশিয়ান আবহাওয়া বিজ্ঞান, ক্লিম্যাটোলজি এবং জিওফিজিক্যাল এজেন্সি (বিএমকেজি) জানাইয়াছে যে, সর্বশেষ এই সুনামিটির উত্পত্তি কোনো ভূমিকম্পের কারণে ঘটে নাই। বিএমকেজি ধারণা করিতেছে যে, লামপাংয়ের মাউন্ট ক্রাকাতোয়া দ্বীপের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত হইতে এই সুনামির উত্পত্তি হইয়াছে। ওই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতের ফলে ভূমিধস ঘটে সাগরতলে। আর তাহার কারণে সৃষ্টি হয় এই সুনামির।
ভূমিকম্প ও সুনামি-প্রবণ দেশ হইবার কারণে ইন্দোনেশিয়ায় উন্নত সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র গড়িয়া উঠিয়াছে। সমুদ্রের পানির চাপ পর্যবেক্ষণের জন্য সুনামি সতর্কতা কেন্দ্রে ১০০টি সিসমোমিটার এবং গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিএনএস প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে বসানো হইয়াছে ২০টি স্টেশন। আমরা জানি, ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব না হইলেও সুনামির সতর্কতা জারি করা যায়। কারণ, সাগরের তলদেশে ভূমিধস কিংবা ভূমিকম্প হইবার কারণেই সুনামি বা উচ্চ জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। কিন্তু গত শনিবারের সুনামির সতকর্তা জারি করিতে ব্যর্থ হয় ইন্দোনেশিয়া। কারণ সমুদ্রের তলদেশের টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্পে যেই সুনামি সৃষ্টি হয়, ওই ভূমিকম্পের ধরন বুঝিয়া উপকূলের জন্যও সুনামির পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভবপর হয়। কিন্তু আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতের ফলে সাগরতলে ভূমিধসের বার্তা সম্ভবত যথাসময়ে সংগ্রহ করিতে পারে নাই বিএমকেজি। এই কারণে গত শনিবারে সংঘটিত দুর্বল সুনামিতেও হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। ইহার পূর্বে চলতি বত্সরের সেপ্টেম্বরে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামিতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়াছিল ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপ। ওই সুনামিতে নিহত হইয়াছিল প্রায় দুই হাজার মানুষ। ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়াসহ ১১টি দেশে আঘাত হানিয়াছিল শতাব্দীর ভয়াবহ সুনামি। ওই সুনামিতে নিহত হইয়াছিল দুই লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ। ২০১১ সালে জাপানের অভিজ্ঞতাও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। নয় মাত্রার ভূমিকম্পের সঙ্গে প্রলয়ঙ্করী সুনামি দেশটিতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাইয়াছিল, সেই ক্ষত ও ক্ষতি আজো পুরাপুরি কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই জাপান।
এক অর্থে দুর্যোগ মানবসভ্যতার সহচরও বটে। ভূমিকম্প বা সুনামির মতো বিপর্যয়ের মুখে মানুষের কীই-বা করিবার আছে—ইহার সদুত্তর পাইতে বসিয়া নাই বিজ্ঞানীরা। মানুষের মূল্যবান জীবন বাঁচাইবার স্বার্থে সুনামির আগাম সতর্কীকরণ পদ্ধতি দিনদিন আরো উন্নত হইতেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা যেই সকল দেশে নিত্য ঘটে, সেই সকল জনপদের অধিবাসীরা আরো সতর্ক হইবেন, ইহাই কাম্য। ইন্দোনেশিয়ার দুর্গত ও শোকাহত মানুষের জন্য শোক ও সমবেদনা জানাই। আমাদের ভালোবাসা ও সহমর্মিতা থাকিবে সকল দুর্যোগপীড়িত মানুষের জন্য।
