শতাধিক ব্যক্তিগত চিঠি পড়লাম। চিঠিগুলোর সবই শেখ হাসিনাকে লেখা। যখন তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি, যখন তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী। আপনজন তিনি, তাঁর নেতা-কর্মী কিংবা যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছে। তাই তো তাঁকে লেখা সবগুলো চিঠি। সাধারণভাবে ‘পত্র’ বা ‘চিঠি’কে একজনের থেকে অপরের কাছে প্রেরিত কেবল লিখিত সংবাদ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু অনেক আগেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পত্রের ধরন পাল্টে গেছে। ঐতিহাসিকভাবে দুই ব্যক্তির মাঝে কাগজে লিখিত পত্রের আদান-প্রদান বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতিতে ‘পোস্টেড লেটার’ তার গুরুত্ব হারিয়েছে। ফ্যাক্স এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে ই-মেলে বার্তা প্রেরণ এর অন্যতম কারণ। তবু এ শতাব্দীতে অনেকের ব্যক্তিগত পত্রকে সৃজনশীল কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কম্পিউটার-ই-মেলের যুগেও হাতের লেখা পত্রকে মানুষকে ধন্যবাদ কিংবা সান্ত্বনা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় ভাবা হয়। অবশ্য শেখ হাসিনার কাছে লেখা পত্রগুলোতে আছে অবারিত ঝরতে থাকা অশ্রুকণা; আছে অসহায়ত্ব নিবারণের প্রার্থনা।
২.
সব চিঠিতেই বর্ণিত হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের দ্বারা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নের ইতিহাস। পত্রলেখকদের মধ্যে কেউ আছেন নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধা, পঙ্গুত্ববরণকারী ছাত্রনেতা, ধর্ষিতার পিতা কিংবা মাতা, স্বামীহারা স্ত্রী; আছে এতিম সন্তানরাও। থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং জনপ্রিয় চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সমীরণ বিশ্বাসকে কেবল রাজনৈতিক আদর্শগত পার্থক্যের কারণে ১৯৯২ সালের ২০ জুলাই প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করে বিএনপি সন্ত্রাসীরা- তাঁর স্ত্রীর পত্রে এই ঘটনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা আছে। ১৯৯৩ সালের ৯ মার্চ কুষ্টিয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট প্রাঙ্গণে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের দ্বারা হামলার শিকার হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য শেখ মোঃ হাসান মেহেদী। সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। সে সময় তাঁর মতো আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী সন্ত্রাসীদের হাতে হতাহত হন। প্রত্যেকের পরিবারে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। তেমনই হত্যার বিচার না পাওয়া অসহায় একটি পরিবার পাবনার ভাঙ্গুর উপজেলার খানমচির ইউনিয়ন ৬নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের পরিবার। শত্রুতাবশত তাকেসহ আওয়ামী লীগের আরো দুই কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করে জোট সরকারের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা। ওই হত্যা ও পরবর্তী নানা ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন রফিকুল ইসলামের স্ত্রী আছমা খাতুন তাঁর পত্রে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের জন্য অস্ত্র হিসেবে ‘ধর্ষণে’র মতো হীন কাজকেও বেছে নেয় বিএনপি-জামায়াতের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা। ঠিক তেমনই হতভাগ্যদের একজন লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগ নেতা রাখাল চন্দ্র মজুমদার। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরই ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তাঁকে বাড়িতে না পেয়ে অস্ত্রের মুখে তার দুই মেয়েকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। চালায় পাশবিক নির্যাতন। শাহরিয়ার কবির সম্পাদিত তিনখণ্ডে প্রকাশিত ‘শ্বেতপত্র: বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ১৫০০ দিন’(২০০৫) গ্রন্থে ২০০১ সালের নির্বাচন-উত্তর বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রায় তিন হাজার সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ধরন সম্পর্কে লেখা হয়েছে— ‘হত্যার চেয়ে শারীরিক নির্যাতন, লুণ্ঠন, গৃহে অগ্নিসংযোগ, বলপূর্বক চাঁদা আদায় ও ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটেছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে ছয় বছরের শিশু থেকে ষাট বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
বিএনপি-জামায়াতের নারী ধর্ষণের মানসিকতা থেকে আমরা শেখ হাসিনাকে লেখা চিঠির বিষয়বস্তুতে প্রবেশ করলে ২০০১ সালের নির্বাচন-উত্তর সহিংসতার চেহারা দেখতে পাবো স্পষ্টভাবে। সেই ঘটনাগুলোর বীভত্সতা তুলে ধরার জন্য যতটা সম্ভব সবিস্তারে বর্ণনা দিয়েছেন পত্রলেখকরা। চিঠিগুলো বলে দিচ্ছে বাস্তব ইতিহাসকে আমরা যেন ভুলে না যাই। এজন্য পত্র লেখকরা মর্মন্তুদভাবে এনেছেন একটি পরিবারের মা, দুটি মেয়ে এবং এক নববধূকে একইসঙ্গে ধর্ষণের ঘটনা। এসব ঘটনার আঘাত সহ্য করতে না পেরে অনেকে সপরিবারে আত্মহত্যাও করেছিল সেই সময়।
৩.
পত্রগুলোতে জামায়াত-বিএনপি’র সন্ত্রাসীদের প্রতি ঘৃণা উচ্চারিত হয়েছে বারংবার। কারণ তারা অসহায়দের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে, লুট করে নিয়ে গেছে মালামাল ও টাকা-পয়সা; কুপিয়ে হত্যা করেছে, পিটিয়ে মেরেছে। খুন হওয়া পরিবারের জীবিত সদস্যরা এখন জীবন্মৃত। নিপীড়ন ও নির্যাতনের আগে তাদের পরিবার ও শিশুদের নিয়ে জীবনের পুরোটা জুড়ে যে আনন্দের বন্যা ছিল তার কথাও লিখেছেন কেউ কেউ। কিন্তু কেবল আওয়ামী লীগ নামক রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী হওয়ার জন্য সব সুখ, সব পরিশ্রম, সংসারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন সবই শেষ হয়ে গেছে তাদের। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে স্বামীকে হারিয়ে সহায় সম্পদহীন হয়ে একাধিক নারী চিঠিতে ঝরিয়েছেন যন্ত্রণার অশ্রু। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে অসংখ্য পরিবার।
৪.
চিঠিগুলো পাঠ করলে দেখা যায়, যে মানুষগুলো খুন কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাদের আক্ষরিক অর্থে কোনো অপরাধ ছিল না। একজন সত্, নিষ্ঠাবান আর স্বাধীনতার পক্ষশক্তির মানুষ হওয়াই যেন তাদের অপরাধ হয়েছিল সেদিন। মূলত সংখ্যালঘু আর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন। তখন রাষ্ট্রের আইন-কানুন, প্রশাসন, পুলিশ সবই যেন বিএনপি-জামায়াতের কাছে জিম্মি ছিল। জামায়াত-বিএনপির চোখে ভালো মানুষগুলো ছিল প্রতিপক্ষ, কারণ তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী; প্রগতির ধারায় জীবন পরিচালিত করতেন। চিঠিতে প্রকাশিত ঘৃণ্য, জঘন্য, বর্বর ঘটনাগুলো দেশের মাটিতে আবার শিকড় বিস্তার করুক এটা আমরা কেউই চাই না।
n লেখক: অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
