বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা। এই অর্জন একদিনে অর্জিত হয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম ও নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। দীর্ঘ ন’মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অনন্য। প্রতিষ্ঠার পর সেই ১৯৫৪ সাল থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে, জনগণকে সচেতন করতে সচেষ্ট থেকেছে। এরপরে ’৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা থেকে শুরু করে আজো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইত্তেফাক বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করি। বাংলার মানুষ দৈনিক ইত্তেফাক পড়ে দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত হতেন, এখনো হচ্ছেন। আমি মনে করি, বস্তুনিষ্ঠতার কারণেই দৈনিক ইত্তেফাক এতোটা পাঠকপ্রিয়।
আজ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উত্সাহ, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় ১৯৫৩ সালের আজকের এইদিনে দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশ করেন। তফাজ্জল হোসেন এই পত্রিকার সম্পাদক হন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দৈনিক ইত্তেফাক হয়ে উঠেছে গণমানুষের মুখপত্র। দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন, সীমাহীন ভালোবাসাই ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের সুদীর্ঘ পথচলার একমাত্র শক্তি ও সাহস। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দৈনিক ইত্তেফাক গণমানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে এসেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন-লালিত যে বাংলাদেশ দৈনিক ইত্তেফাক সেই জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে উত্সর্গ করেছিল। সেই পথ সহজ ছিল না, ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু সত্ সাংবাদিকতার কাজই হলো সেই কঠিন পথ পাড়ি দেয়া। দৈনিক ইত্তেফাক সেই মন্ত্র আজো হূদয়ে ধারণ করে চলেছে। সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে সময়ের দাবি মেটানো। সেইদিক থেকে দৈনিক ইত্তেফাক তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সময়ের দাবি মিটিয়ে এসেছে, এখনো মিটাচ্ছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তত্কালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের যে ভরাডুবি হয়েছিল তার পেছনে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার শক্তিশালী রিপোর্ট ও মানিক মিয়ার ক্ষুরধার লেখনির বিরাট ভূমিকা ছিল। শুধু তাই নয়, ১৯৬৬ সালের ৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ৬-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করলে দৈনিক মর্নিং নিউজ, দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক আজাদ ৬-দফার বিরোধিতা করে। তখন দৈনিক ইত্তেফাক শুধু ৬-দফার পক্ষেই অবস্থান নেয়নি, অন্যতম প্রচারকের ভূমিকাও পালন করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় এসে ইত্তেফাক পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। এ কারণেই আইয়ুব সরকার প্রথম দফায় ১৯৬৬ সালের ১৭ জুন থেকে ১১ জুলাই এবং দ্বিতীয় দফায় ১৯৬৬ সালের ১৭ জুলাই থেকে ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ রাখে। পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেনকেও একাধিকবার কারান্তরীণ করা হয়। পরে গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ঊনসত্তুরের ১০ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পুনরায় প্রকাশিত হয়। ১৯৭১ সালের পয়লা মার্চের সামরিক আইনের বিধান অগ্রাহ্য করেই ইত্তেফাক সে সময়কার অসহযোগ আন্দোলনের খবর নিয়মিতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। সেই সময় সরকার আপত্তিকর সংবাদ পরিবেশনের দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করেছিল। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাক তার কোনো তোয়াক্কা করেনি। মানুষের মুক্তির প্রশ্নে, স্বাধীনতার প্রশ্নে, অস্তিত্ব বিলীনের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি নিরবচ্ছিন্নভাবে সমর্থন যুগিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় ২৫শে মার্চ রাতে পাকসেনারা ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে দেয়, বন্ধ হয়ে যায় প্রকাশনা। পরবর্তীকালে জনগণের কথা চিন্তা করে আবারো ঘুরে দাঁড়ায় দৈনিক ইত্তেফাক। মে মাস থেকে শুরু হয় নতুন করে প্রকাশনা। ইত্তেফাকের এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের পরে নতুন বাস্তবতায় দৈনিক ইত্তেফাক নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হচ্ছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ইত্তেফাক জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে। সময়ের দাবি মেটাতে ইত্তেফাকের বিন্যাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের অবস্থান প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো বদলায়নি।
বর্তমান প্রজন্মের কাছেও দৈনিক ইত্তেফাক খুবই জনপ্রিয়। কেননা দেশের অন্য জাতীয় পত্রিকাগুলোর তুলনায় দৈনিক ইত্তেফাক তরুণদেরকে বেশি মূল্যায়ন করে। তরুণদের লেখা গল্প, কবিতা, সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় কলাম, মতামত যখন অন্য পত্রিকাগুলো ছাপতেই চায় না, তখন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা এক্ষেত্রে খুবই উদার। সপ্তাহে পাঁচদিন দৈনিক ইত্তেফাক তরুণদের লেখা প্রকাশ করছে। তরুণ প্রজন্মের একজন হিসাবে আশা করি আগামীতেও দৈনিক ইত্তেফাকের এই ধারা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের মাটি ও গণমানুষের মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাক। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয়ে আজ অবধি স্বমহিমায় বহুল প্রচারিত। দেশ ও দেশের জনগণের দুঃখ-দুর্দশা ও সম্ভাবনার কথা সবসময় চিন্তা করে দৈনিক ইত্তেফাক। আজকের বাংলাদেশের এই সাফল্যের শিখরে ওঠার পেছনে রয়েছে ইত্তেফাকের অসামান্য ভূমিকা। আজকের এইদিনে ইত্তেফাক পরিবারের সবার প্রতি রইল অফুরন্ত ভালোবাসা ও শুভকামনা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
