শুদ্ধিকরণ পর্ব-৫
২.৩ প্রত্যয়ঘটিত অশুদ্ধি
ব্যাকরণের রূপতত্ত্ব অংশে আলোচিত হয় প্রত্যয় । নতুন শব্দ গঠনে প্রত্যয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য । শব্দের রূপ পরিবর্তনে, অর্থ পরিবর্তনে এবং নতুন শব্দ গঠনে এসব প্রত্যয়ের ভূমিকা রয়েছে । প্রত্যয়ের সঠিক ব্যবহার না জানলে বানান শুদ্ধ হয় না । ফলে,প্রত্যয়ঘটিত অশুদ্ধি ঘটে । ব্যাকরণে কৃত্-প্রত্যয় ও তদ্ধিত প্রত্যয় পৃথকভাবে আলোচনা করা হয়েছে । ২১ টি বাংলা কৃত্-প্রত্যয় এবং ১১টি সংস্কৃত প্রত্যয়ের ওপর নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে আলোচনা করা হয়েছে । এছাড়া ১৬টি বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়, ১০টি বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় এবং ১৮টি সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় ওপর নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে আলোচনা করা হয়েছে ।
প্রত্যয়ের সাহায্যে গঠিত কিছু শব্দ ও উদাহরণ দেওয়া হলো যেগুলো বানান অশুদ্ধি হওয়ার মতো :
নিয়ম- ১ :অনি, আনি, আরি, আমি/মি,আলি, উরি, আটিয়া/টে, উরি/উনি/নি, ই, তি ইত্যাদি প্রত্যয় যোগে গঠিত শব্দে স্বভাবতই ই-কার হয়। যেমন :চিরনি>চিরুনি, বাঁধনি>বাঁধুনি, জানানি, শুনানি, উড়ানি, নিড়ানি, পূজারি, ধুনারি, ভণ্ডামি, চোরামি, পাকামি, ঘটকালি, চতুরালি, মিতালি, রুপালি, সোনালি, ডুবুরি, চালাকি, সরকারি, কাঠি, ওস্তাদি, ভাজি, বেড়ি, ঘাটতি, কাটতি, উঠতি, বাড়তি ইত্যাদি ।
নিয়ম- ২ :আনি>য়ানি, গিরি, দারি, বন্দি ইত্যাদি বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় যোগেগঠিতশব্দে ই-কারহয়।
যেমন :হিন্দুয়ানি, দাদাগিরি, কেরানিগিরি, পণ্ডিতগিরি, জমিদারি, অংশীদারি, জবানবন্দি, সারিবন্দি, নজরবন্দিইত্যাদি ।
নিয়ম-৩ : ইত, ইল, ইম, ইমা, ইত্র, ইষ্ণু, ইষ্ঠ ইত্যাদি সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে গঠিত শব্দে ই-কার হয়।
যেমন :কুসুমিত, তরঙ্গিত, কণ্টকিত, উজ্জীবিত, উল্লিখিত, পঙ্কিল, ঊর্মিল, ফেনিল, জটিল, বর্ণিল, সর্পিল, অগ্রিম, আদিম, রক্তিম, নীলিমা, মহিমা, কালিমা, চরিত্র, পবিত্র, চলিষ্ণু, বর্ধিষ্ণু, সহিষ্ণু, গরিষ্ঠ, লঘিষ্ঠ, বলিষ্ঠ, কর্মিষ্ঠ ইত্যাদি ।
নিয়ম- ৪ :ত্ব, তা, নী,ণী প্রত্যয় যোগ হলে ই-কার হয় ।
যেমন :দায়িত্ব (দায়ী),প্রতিদ্বন্দ্বিতা (প্রতিদ্বন্দ্বী), প্রার্থিতা (প্রার্থী), দুঃখিনী (দুঃখী), অধিকারিণী (অধিকারী),সহযোগিতা (সহযোগী), মন্ত্রিত্ব (মন্ত্রী), একাকিত্ব (একাকী), স্থায়িত্ব (স্থায়ী), কৃতিত্ব (কৃতী) ইত্যাদি।
নিয়ম- ৫ : ঈ, ঈয়, নীন (ঈন্) প্রত্যয় যোগ হলে ঈ-কার হয় ।
যেমন :জ্ঞানী, গুণী, সর্বজনীন, কুলীন, নবীন, জাতীয় (জাতি), দেশীয় (দেশি), পানীয় (পানি), জলীয়, স্থানীয়, স্মরণীয়, বরণীয়, গোপনীয়, ভারতীয়, মাননীয়, বায়বীয়, প্রয়োজনীয়, পালনীয়, তুলনীয়, শোচনীয়, রাজকীয়, লক্ষণীয়, করণীয় ইত্যাদি ।
নিয়ম- ৬ :ইক প্রত্যয়যুক্ত হস্তে
(ক) যদি শব্দের প্রথমে অ-কার থাকে তা পরিবর্তন হয়ে আ-কার হয় ।
যেমন :অঙ্গ>আঙ্গিক, বর্ষ>বার্ষিক, পরস্পর>পারস্পরিক, সংস্কৃত>সাংস্কৃতিক, অর্থ>আর্থিক, পরলোক>পারলৌকিক, প্রকৃত>প্রাকৃতিক, প্রসঙ্গ>প্রাসঙ্গিক, সংসার>সাংসারিক, সপ্তাহ>সাপ্তাহিক, সময়>সাময়িক, সংবাদ>সাংবাদিক, প্রদেশ>প্রাদেশিক, সমপ্রদায়>সামপ্রদায়িক, শরীর>শারীরিক, গঠন>গাঠনিক ইত্যাদি।
(খ) যদি শব্দের প্রথমে ই বা ই-কার কিংবা ঈ বা ঈ-কার কিংবা এ বা এ-কার থাকে তা পরিবর্তিত হয়ে ঐ-কার হয় ।
যেমন :বিশ্ব>বৈশ্বিক, শিল্প>শৈল্পিক, বিপ্লব>বৈপ্লবিক, চীনা>চৈনিক, বিষয়>বৈষয়িক, বিচার>বৈচারিক, ইচ্ছা>ঐচ্ছিক, রেখা>রৈখিক, লেখা>লৈখিক, এক>ঐকিক, দেহ>দৈহিক, বেদ>বৈদিক, সেনা>সৈনিক, দেশ>দৈশিক ইত্যাদি।
(গ) যদি শব্দের প্রথমে উ বা উ-কার কিংবা ঊ বা ঊ-কার কিংবা ও বা ও-কার থাকে তা পরিবর্তিত হয়ে ঔ-কার হয় ।
যেমন :মূল>মৌলিক, মুখ>মৌখিক, ভূত>ভৌতিক, যুক্তি>যৌক্তিক, যোগ>যৌগিক, লোক>লৌকিক, কোণ>কৌণিক, পুনঃপুন>পৌনঃপুনিক, পুরাণ>পৌরাণিক ইত্যাদি ।
