মাতৃভাষার শুদ্ধ চর্চা হোক

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:১২

 

বহু ত্যাগ, লড়াই ও রক্তের বিনিময়ে বাঙালি পায় ভাষার অধিকার। অন্যদিকে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়।

কিন্তু সর্বত্র বাংলা ভাষার অপব্যবহারে ভাষার মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভাষার অপব্যবহার রোধে ভাষার মাসে তরুণরা কি ভাবছেন!

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন— জান্নাতুল ফেরদৌস

মো. আশিকুর রহমান

ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

আমরা ভাষা পেলাম ঠিকই, কিন্তু আমরা কি পেরেছি ভাষার সঠিক মর্যাদা দিতে? আমরা কি পেরেছি আমাদের বাংলা ভাষা ও তার ইতিহাসকে সঠিক মূল্যায়ন করতে? নাহ! আমরা পারিনি। যদি সত্যিই পারতাম ভাষার সঠিক মর্যাদা দিতে তবে বাংলা ভাষা ব্যবহারের এই করুণ অবস্থা হতো না! এখনও বাস, গণপরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অপব্যবহার হচ্ছে, ভাষাকে অপমান করা হচ্ছে। এই ভাষার মাসে, ভাষা দিবসে শপথ হোক, বাংলা ভাষার সঠিক মর্যাদা দিয়ে তার সঠিক ব্যবহার করব। বিশ্ব দরবারে বাংলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও মধুর ভাষায় রূপান্তর করব। গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, এই আমার পরিচয় এই আমার অস্তিত্বের সূচনা।

০০০

মাহবুবুর রহমান

আইসিটি বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান

ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যেভাবে তরুণ ছাত্র-জনতা বুলেটের কাছেও মাথানত করেনি, মাতৃভাষায় কথা বলার ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শহিদ হয়েছেন, বর্তমান তরুণ সমাজকেও এভাবে দেশের প্রতি সর্বদা আত্মোত্সর্গ হতে হবে। একুশ বাঙালি জাতির বীরত্বের প্রতীক, আমাদের চেতনা ও গৌরবের উত্স। বাঙালি সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোকাচার ও জীবনবোধের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য একুশের প্রেরণাই শ্রেষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, প্রতিটা বাঙালির সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটা মানুষই নিজ মাতৃভাষাকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। শুধু একদিন নয় বরং প্রতিদিন ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান দেখাতে হবে।

০০০

ফারহানা নওশিন তিতলী

আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

 

ভাষার অধিকার আদায়ে আমাদের রয়েছে হূদয় বিদারক ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। তবুও আমরা ভাষার যথাযথ ব্যবহার করছি না! আধুনিক সময়ে স্মার্টনেসের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়, ইংরেজিতে কে কত ভালো কথা বলতে পারে তার ওপর। একবারের জন্যও ভাবছি না যে আমাদের মাতৃভাষা অর্জনের পেছনের আত্মত্যাগের ইতিহাসটি কত তাত্পর্যপূর্ণ। ইংরেজিতে অনর্গল যে কথা বলছে তাকে বাহবা দিচ্ছি। ব্যতিক্রম ব্যতীত আমাদের তরুণ সমাজের বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ খুব কম লক্ষ্য করা যায়। বাংলা ভাষার এমন অবস্থার জন্য তো শহিদরা তাদের জীবন বিলিয়ে দেননি! নিজ ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে আমাদের উচিত বাংলা ভাষার চর্চা ও বাংলা ভাষার যথাযথ ব্যবহার করা।

০০০

জান্নাতুল নাঈমা

বাংলা বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি সগৌরবে; কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ চর্চা ভুলে গেছি আমরা। বিভিন্ন বিপণীবিতান, দোকানপাট এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানেও ভুল বানান লেখা থাকে। বাংলা বিভাগের একজন ছাত্রী হিসেবে সেটা মেনে নিতে পারি না। অনেকে কথা বলার সময়ও অনেক শব্দ বিকৃতভাবে উচ্চারণ করে। আবার আমরা ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষায় কথা বলাকে স্মার্টনেস মনে করি। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা ক্ষণিকের তরে জেগে উঠি। একটু পরেই শহিদদের উত্সর্গের কথা ভুলে যাই! তাই একজন তরুণ হিসেবে আমি মনে করি, ভাষার মর্যাদা সবসময়ই দিতে হবে, প্রতিটি ক্ষেত্রে মাতৃভাষার শুদ্ধ চর্চা করতে হবে।

০০০

মো. তরিকুল ইসলাম

আইন বিভাগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

 

একজন বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ হয় যে, পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। তবে একজন বাঙালি তরুণ হিসেবে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষার এমন অযাচিত ব্যবহার দেখে আমি লজ্জিত ও শঙ্কিত। বাংলা ভাষাকে এখন গ্রাম্য ও নিচু শ্রেণির মানুষের ভাষা হিসেবে পরিগণিত করা হচ্ছে, ধনী শ্রেণি তাদের সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়ে গর্ববোধ করে। অথচ এই বাংলা ভাষাতে মিশে আছে শহিদ রফিক, জব্বার ও সালামদের মতো বহু তরুণের টগবগে রক্ত। আমার প্রত্যাশা—শিক্ষাব্যবস্থা, আইন-আদালত, প্রশাসনসহ বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বাধ্যতামূলক ব্যবহার চালু হোক।

০০০

তানভীর ফয়সাল

পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

একুশ আমাদের ইতিহাসের সেই গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি করে, বাংলা ভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা কতটা অবদান রাখতে পেরেছি? একুশের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলাকে পুরোপুরি চালু করা, বাস্তবে সত্যিই কি সেটা ঘটছে! আমাদের উচ্চ আদালত, প্রশাসনসহ সর্বত্র ইংরেজির দাপট। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও একুশ ও স্বাধীনতার চেতনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। সংকট সমস্যার সমাধান ও অধিকার আদায়ে যে শিক্ষা ৫২ থেকে পেয়েছি সে চেতনা ধারণ করে সব দুর্নীতির মূলোত্পাটনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলি এবং ভাষার ব্যবহারে সচেষ্ট হই—এই হোক একুশের অঙ্গীকার।