রিয়াদ খন্দকার
২১ জানুয়ারি স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে জয়ের আনন্দে গোটা দল যখন মশগুল, তখন হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশ থেকে আসে ভয়াবহ দুঃসংবাদ। ২২ জানুয়ারি তার একমাত্র বোন খাদিজা খাতুন চলে গেছেন না ফেরার দেশে। যমজ সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান তিনি। এই দুঃখজনক সংবাদে খুব স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছিলেন আকবর আলী। কিন্তু তখনই মনে পড়ে দেশের প্রতি দায়িত্ব। বুকে শোক চেপে রেখে দারুণ নেতৃত্বে দলকে নিয়ে যান ফাইনালে। ভারতকে ১৭৭ রানে গুটিয়ে দিয়ে ৩ উইকেট হাতে রেখেই বিশ্বকাপ ছিনিয়ে আনেন এই তরুণ টাইগার।
অধিনায়ক হিসেবে সামনে আসার তুলনায় আকবর বেশি আনন্দ পান সাফল্যের নেপথ্যে থাকতে। আঠারোর ঔদ্ধত্যকে বশে রাখা এই তরুণের শরীরী ভাষায় আগ্রাসন কম। পছন্দ করেন ঠান্ডা মাথায় নেতৃত্ব দিতে।
রংপুরের ছেলে আকবর প্রথাগত ক্রিকেট প্রশিক্ষণে হাতেখড়ি সপ্তম শ্রেণিতে। বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনূর্ধ্ব ১৮ দলের হয়ে প্রথম ‘লিস্ট এ ম্যাচ’ খেলেন ২০১৯ সালের ৮ মার্চ। বিপক্ষে ছিল আবাহনী লিমিটেড। তার আগেই অবশ্য হয়ে গিয়েছে টি-২০ ম্যাচে অভিষেক। ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি টি-২০ ম্যাচে তার অভিষেক। বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হয়ে তিনি খেলেন প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং ক্লাবের বিরুদ্ধে। এখন পর্যন্ত ১৩টি ‘লিস্ট এ ম্যাচে’ তার মোট রান ২৯৫। সর্বোচ্চ ৫৬। দুটি টি-২০ ম্যাচে তিনি করেছেন ৮৫ রান। সর্বোচ্চ রান ৮৫। তার হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নেতৃত্বের ব্যাটন। প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই আকবর আলী আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ যে শুধু নক আউটে যাবে তাই নয়, বিশ্বকাপও জিতবে। অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপ যত এগিয়েছে, ততই সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে আকবর আলীর ভবিষ্যদ্বাণী। লিগ পর্যায়ে কঠিন গ্রুপেই ছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে, স্কটল্যান্ডের মতো দল। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে জিতে আকবরের অধিনায়কত্বে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে পা রাখে বাংলাদেশ। এক বছরের বেশি সময় ধরে দল হিসেবে খেলায় তাদের মধ্যে বন্ডিং গড়ে ওঠেছে বেশ। যার ফসল, গত রবিবার দক্ষিণ আফ্রিকার পোচেস্ট্রুমে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়। অভাবনীয় এই সাফল্যে কৃতিত্বের বড় অংশ আকবর আলী দিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে।
মাঠের বাইরে সহজ জীবনদর্শনে বিশ্বাসী তরুণ এই অধিনায়ক। ক্রিকেট তার জীবন। কিন্তু জীবন ক্রিকেটসর্বস্ব নয়। জয়ের পাশাপাশি পরাজয়কেও মেনে নিতে শিখেছেন তিনি। মনে করেন, ক্রিকেটই জীবনের শেষ কথা নয়। মাঠের বাইরেও একটা বড় জীবন আছে।
একাধারে ব্যাটসম্যান-উইকেটকিপার-অধিনায়ক। তিনি উইকেটের পিছনে থেকে বিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসেন। এতে তার অধিনায়কত্বে সুবিধে হয়। জাতীয় দলের অধিনায়কত্বকেও বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ তিনি। বরং, এই তরুণ মনে করেন, দলীয় ক্রীড়া হিসেবেই দেখা উচিত ক্রিকেটকে।
উইকেটকিপিংয়ের মতো ‘থ্যাঙ্কসলেস’ কাজের পাশাপাশি ব্যাটিং অর্ডারেও নিজেকে রাখেন নীচের দিকে। ব্যাট করতে নামেন ছ নম্বরে। নিজেকে ‘ফিনিশার’ বলতে পছন্দ করা রংপুরের এই তরুণের নেতৃত্বে শুরু হলো দেশের ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়।
