মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
মাটি। সে আবার বিক্রি হওয়ার মতো কিছু নাকি? তা-ও আবার অনলাইনে বিক্রি হয়! মাটি কেনার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মাসে দুই মেট্রিক টনেরও বেশি মাটি বিক্রি হয়। মাটি বিক্রি করে পুরো একটা পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছে। তবে নিরেট সাধারণ মাটি নয়। এগুলো হলো জৈব মাটি। ছাদ বাগানের অপরিহার্য বস্তু। আর মাটি বিক্রেতার নাম হলো শাকিল হোসাইন। তিনি ঝিনাইদহ কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ছাত্র। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী (কুটিপাড়া) গ্রামের নুরুল ইসলামের একমাত্র ছেলে। শাকিল মাটি বিক্রি করেন ফেসবুকে প্রচারের মাধ্যমে। তার ফেসবুক আইডির নাম হলো ‘ডিজিটাল ছাদ বাগান শাকিল’। আর ফেসবুক পেইজের নাম ‘শখের ছাদ বাগান, কৃষি পণ্য ক্রয়-বিক্রয়’। দেশের বিভিন্ন এলাকার ছাদ বাগানীরা তার প্রধান ক্রেতা। রীতিমতো মাটি তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন শাকিল। ক্রেতাদের কাছে তার এ মাটি রেডি সয়েল ও ক্যাকটাস পটিং সয়েল হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি ভার্মি কম্পোস্টও তৈরি হচ্ছে। কৃষির প্রতি শাকিলের আগ্রহ সেই শৈশব থেকে। ২০১৬ সালে তিনি এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন ঝিনাইদহ কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (এটিআই)। বর্তমানে তিনি ষষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র। নিজ উদ্যোগে ২০১৭ সালে বাড়িতে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরি শুরু করেন। যা গুণগতমানে খুবই উন্নত। কম মূল্য হওয়ার কারণে শাকিলের কম্পোস্ট সার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। পাশাপাশি দিন দিন এর চাহিদাও বাড়তে থাকে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে। শাকিলের নিজের বাগান আছে। যার শুরু ২০১৮ সালে। তিনি নিজের গাছে সার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। একাধিকবার পরীক্ষার পর সফল হলে তবেই বাজারজাত করেন বলে জানান। অন্য একজনের ভবনের ছাদেও তিনি আকর্ষণীয় বাগান করেছেন। ইতিমধ্যে ফলজ ও বনজ গাছ লাগিয়ে সকলের দৃষ্টি কেড়েছেন। সার বিক্রি করে শাকিলের পরিবারে স্বচ্ছলতা এসেছে। প্রতি কেজি সার মাত্র ১৫ টাকায় বিক্রি করেন। মাস শেষে তার পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকা লাভ থাকে বলে জানান। দুজন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে তার কারখানায়। জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়া সর্ম্পকে জানতে চাইলে শাকিল জানান, প্রথমে তিনি নিজ এলাকা থেকে বেলে দো-আঁশ মাটি সংগ্রহ করেন। এই মাটি কয়েকদিন রেখে দেওয়ার পর নানাভাবে মিশ্রণ করেন। তারপর চালনি দিয়ে চেলে ময়লা বা আবর্জনা আলাদা করে নেন। এরপর ওই মাটিতে তিনি পরিমাণমতো বালি, ভার্মি কম্পোস্ট সার, চুন, কোকোডাস্টসহ কয়েকটি উপাদান ছিটিয়ে দেন। কয়েক দফা মিশ্রণ করার পর তৈরি হয়ে যায় তার ছাদবাগানের মাটি। আপাতত তিনি দু’ধরনের মাটি বিক্রি করেন। রেডি সয়েল ১২ টাকা কেজি আর ক্যাকটাস পটিং সয়েল ১৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। ক্রেতাদের কাছে তিনি কুরিয়ারে মাটি পৌঁছে দেন। ক্রেতারা বিকাশ অথবা রকেটের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে থাকেন। শাকিলের মাটি ব্যবহার করে ছাদ বাগান করেছেন ঢাকার সামিয়া জামান। তিনি বলেন, জৈবসার, কোকোডাস্ট ও অন্যান্য উপাদান ঠিকমতো থাকায় শাকিলের মাটিতে গাছ অনেক ভালো হচ্ছে। মাটির কোয়ালিটি অনেক ভালো বলে জানান তিনি। স্থানীয় কৃষি অফিস শাকিলের মাটির কারখানা পরিদর্শন করে তাকে একটি প্রদর্শনী দিয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তা শাকিলের নয়নজুড়ে স্বপ্ন আর সম্ভাবনা। ইতিমধ্যে কর্মঠ এই তরুণ স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। শাকিলের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হলো—পড়াশোনা শেষ করে আরো বড়ো পরিসরে মাটি তৈরির কারখানা স্থাপন করবেন; যেন বাগানপ্রেমীরা সহজে মানসম্মত জৈব সার পেতে পারেন। প্রত্যন্ত মফস্বলে অল্প বয়সী উদ্যোক্তা শাকিল ঝিমিয়েপড়া তরুণদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকেই।
