গুণী নারীদের ফেলোশিপ অর্জন

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:১৭

 

অ্যাকুমেন একাডেমি কর্তৃক প্রদত্ত সম্মানিত অ্যাকুমেন ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন আমাদের দেশের বেশ কয়েকজন গুণী নারী। তাদের কয়েক জনকে নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।  লিখেছেন— মাহবুব নাহিদ

মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী

মেয়েদের সুরক্ষার জন্য, তাদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী লড়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে অসাধারণ কাজই তাকে এনে দিয়েছে এই ফেলোশিপ। সাথীর জন্ম রাঙ্গামাটি জেলার চন্দ্রঘোনায়। বাবার নাম বিজয় কেতন চাকমা এবং মায়ের নাম নীলিমা দে। রাঙ্গামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক এবং রাঙ্গামাটি মহিলা কলেজে পড়েছেন উচ্চ মাধ্যমিক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি এবং এলএলএম পাশ করেছেন তিনি।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সাপোর্টিং পিপল অ্যান্ড রিবিল্ডিং কমিউনিটিস। এই সংগঠন এমন একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করেছে, যেখানে তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা তাদের স্বপ্নকে ব্যক্ত করার সুযোগ পায় এবং তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে পারে। লিঙ্গ সমতা, নারীবাদ, নারী অধিকার, পাহাড়ি নারী ও জাতিগোষ্ঠীদের অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে এ সংগঠন। সংগঠনটি নারীদের শারীরিক, মানসিক, যৌন হয়রানির থেকে রক্ষার আইনি ও কৌশলগত পদ্ধতি জানায়, নারীদের সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মনোবল প্রদান করে।

সোহারা মেহরোজ শচী

তিনি একাধারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। ছোটোবেলা থেকেই বিতর্ক, নজরুল-রবীন্দ্রসংগীতে ব্যাপক দখল ছিল তার। তিনি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ও-লেভেল এবং এ-লেভেল পড়েছেন। আমেরিকার ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে পলিটিক্যাল সাইন্সে পড়েছেন স্নাতক। বর্তমানে তিনি ইউএনডিপি বাংলাদেশের টিম লিড হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি কাজ করে যাচ্ছেন জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারীদের কাজে যেসব অসুবিধা ঘটে তা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। মহিলাদের কৃষিকাজের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করছেন, উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছেন। সরকারি পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ানো, আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানো, জলবায়ু বাজেটসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করছেন তিনি। ইউএনডিপি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একত্রিত বিভিন্ন প্রকল্প দেখাশোনা পর্যবেক্ষণ, তথ্য পর্যালোচনার কাজ করেছেন তিনি।

জারিন হোসেইন

লিঙ্গসমতা ও শিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে সবার কাছে বহুল জনপ্রিয় হারস্টোরি ফাউন্ডেশন এবং এর সিইও জারিন হোসেইন। তিনিও নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাকুমেন ফেলোশিপের জন্য। তার ছোটোবেলা কেটেছে চট্টগ্রামে। মা পড়াশোনা করতেন বলে দাদি ও নানির সান্নিধ্যে বড়ো হয়েছেন তিনি। তার নানি সত্তরের দশকে চট্টগ্রামে ঘাসফুল নামক প্রথম এনজিও প্রকাশ করেছিলেন। জারিন হোসেইন পড়াশোনা করেছেন হলিক্রস ও স্কলাস্টিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুটেস-এর স্মিথ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক করেছেন। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট সনদ ও বাংলাদেশের আইসিএবি থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির ওপর ডিগ্রি নিয়েছেন।   

 বর্তমানে তিনি হারস্টোরি ফাউন্ডেশনের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফাউন্ডেশনটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। হারস্টোরি গল্প বলা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশু, তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের অনুপ্রাণিত করে। তাদের একটি প্রকাশনা রয়েছে, তারা বিভিন্ন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফেলোশিপ প্রদান করে এবং তারামন ডট কম নামে মেয়েদের জন্য মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত একটি মিডিয়া প্ল্যাটফরম পরিচালনা করে।

নাসরীন সুলতানা মিতু

অ্যাকুমেন ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন প্রজেক্ট টিকটালিকের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নাসরীন সুলতানা মিতু। তার জন্ম সিলেটে, বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে সিলেট, ময়মনসিংহ এসব জেলায় থাকা হয়েছে। তার পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে— বিজ্ঞান শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেছেন প্রায় ছয় বছর।

তিনি পেশাগতভাবে কার্টুন আঁকছেন ২০০৬ সাল থেকে। বিজ্ঞান শিক্ষায় অল্পবিস্তর পড়াশোনা থাকায় একসময় তার মনে হলো পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞান বইয়ের তথ্যগুলো যদি কার্টুন ও কমিকসের উপস্থাপন করা যায় কেমন হয়! এই আইডিয়া থেকেই ‘প্রজেক্ট টিকটালিক’ নামক প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু। কার্টুন সব বাচ্চারাই পছন্দ করে, তাই এই মিডিয়ার ব্যবহার করে বিজ্ঞান শেখাকে মজার ও আকর্ষণীয় করাই প্রজেক্ট টিকটালিকের মূল উদ্দেশ্য।

ইশরাত করিম ইভ

আমাল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ডিরেক্টর ইশরাত করিম ইভ নির্বাচিত হয়েছেন এই ফেলোশিপের জন্য। তার বেড়ে ওঠা বগুড়া শহরে। বাবা-মা ও তিন ভাইবোনের সংসার ছিল তাদের। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে বিবিএ করেন। কলারাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেন তিনি। ২০১৪ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি। ২০১৫ সালেই শুরু করেন আমাল ফাউন্ডেশনের কাজ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এনজিওতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বিভিন্ন পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাল ফাউন্ডেশনের পথচলা তার। তিনি মিরপুর ধামালকোট বস্তিতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে, যৌন হয়রানি নিয়ে কাজ করেন।

আমাল ফাউন্ডেশনের মূলত চার ধরনের কর্মকাণ্ড রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাবলম্বীকরণ, দুর্যোগ সহায়তা নিয়ে কাজ করে থাকেন তারা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল বাচ্চাদের জন্য রয়েছে স্কুল। নারীদের জন্য রয়েছে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার। রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের রয়েছ বিশেষ কিছু কার্যক্রম। টেকনাফ ও উখিয়ায় তাদের বেশ কয়েকটি স্কুল ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার রয়েছে।

আছিয়া খালেদা নীলা

নারীদের নিয়ে এক ভিন্নধর্মী কাজ করছেন আছিয়া খালেদা নীলা। তার এই কাজ তাকে এনে দিয়েছে অনেক সম্মাননা। উইমেন ইন ডিজিটালের প্রতিষ্ঠাতা নীলা নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাকুমেন ফেলোশিপের জন্য। তিনি একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। এমএস করেছেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার বাবা সবসময়ই তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন যে, তিনি দেশের জন্য কিছু করবেন। তিনি যুক্ত আছেন ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন-এর আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে। বাংলাদেশ থেকে তিনিই প্রথম এই পজিশনের জন্য সিলেক্ট হন। তিনি এসবের বাইরেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্টার্ট আপের মেন্টর হিসেবেও কাজ করে থাকেন তিনি।

প্রযুক্তির মাধ্যমে যাতে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হয়, সেজন্যই তার উইমেন ইন ডিজিটাল প্রতিষ্ঠা। ডিজিটাল সরঞ্জামের সঠিক ব্যবহার ও প্রযুক্তি বিকাশের জন্য রয়েছে ট্রেনিং ও ওয়ার্কশপ। যারা উদ্যোক্তা হতে চান তাদের জন্য বিশেষ কার্যক্রম। তাদের টেক স্কুলের মাধ্যমে তারা কোডিং এবং ডিজাইনিংয়ের ট্রেনিং দিয়ে থাকেন। দেশের ১৮টি জেলায় রয়েছে উইমেন ইন ডিজিটালের কার্যক্রম। বাইরেও পাঁচটি দেশে তাদের চাপ্টার রয়েছে। ২০১৭ সালে তার প্রতিষ্ঠান আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আয়োজন করে ন্যাশনাল হ্যাকাথন ফর উইমেন ক্যাম্পেইন, যা দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলে।