খাদিজা আক্তার মুন্নী
ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গাতে ডা. মালিহা রশিদের (ডাক নাম লাকি) জন্ম। বাবা ডাক্তার, মা গৃহিণী। ছোটোবেলা থেকেই বাবার আদর্শে বড়ো হতে চেয়েছেন তিনি। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়ো। মুক্তিযুদ্ধকালীন চিকিত্সার অভাবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে এক ভাই মারা যান। বাবার আদর্শ এবং মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে সব ভাইবোনই আজ প্রতিষ্ঠিত বলে জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। তখন দেখেছি কীভাবে আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে লুকিয়ে চিকিত্সা করেছেন। তখন থেকেই ঠিক করেছি আমিও বাবার মতো ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করব। এমনও ভেবেছি, ডাক্তারি পড়তে না পারলে পড়াশোনায় করব না। আমার মা হচ্ছে রত্নগর্ভা। মা’র জন্যই আজ আমরা প্রতিটি ভাইবোন প্রতিষ্ঠিত।
কাজী মাহবুল্লাহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড ডিগ্রি কলেজ থেকে পাশ করে ভর্তি হন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে। তিনি বলেন, আমাদের সময়ে স্কুলে কেউ সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেনি। আমি একা সায়েন্স নিয়ে পড়তাম। আমি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তাম একা।
এসএসসি ও এইচএসসিতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল থেকে এমবিবিএস পাশ করে তিনি এফসিপিএস করেন পরবর্তীকালে একই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন বেশ কিছুদিন। পরবর্তীকালে ঢাকা মেডিক্যালে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বেশ অনেক বছর চাকরির মেয়াদ থাকাতেও স্ব-ইচ্ছায় চাকরি ছেড়ে সেন্ট্রাল মেডিক্যালে যোগদান করেন। বর্তমানে সেখানেই কর্মরত আছেন। চেষ্টা করেন একজন রোগীকে ভালোভাবে চিকিত্সা দিতে।
তিনি বলেন, যুদ্ধকালের কথা, আমি আর্মিদের খুব ভয় পেতাম। নারী নির্যাতনের কথা তখন শুনতাম। ভয়ে লুকিয়ে থাকতাম। আমার এখনো মনে পড়ে আমার প্রতিবেশী জয়া সেনগুপ্তার কথা। উনারা বেঁচে থাকার জন্যই কতই না লড়াই করে গেছেন। উনি এবং উনার এক ভাই-ই শুধু উনাদের পরিবারের মধ্যে বেঁচে ছিলেন; বাকি সবাইকে মেরে ফেলেছে। প্রায় ৪৫ বছর পর উনাকে আমি ফেসবুকের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছি। আমার এখনো কানে বাজে সেই ২৫ মার্চের সেই দিনের কথা। যুদ্ধের পর স্বাধীনতার যে সুখ, কী আনন্দ ছিল সেদিনের গানগুলোর কথায়। এত কিছুর মধ্যে দিয়েও আমি আমার জীবনের স্বপ্ন পূরণ করেছি। কৈশোর কাটিয়েছি মুক্ত পাখির মতো। সেই গ্রাম থেকে এসেও আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। ফরিদপুর শিশু হাসপাতালে আমি আমার বাবার নামে একটি ওয়ার্ড করেছি। আমি আমার গ্রামে মাঝে মাঝে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প করি। ইচ্ছে আছে ফরিদপুরে একটি হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম এবং একটি রিহ্যাবিলিশন সেন্টার তৈরি করার; জানিনা পূরণ হবে কি না।
জীবনের পুরোটায় ছিল নিয়মমাফিক। ঠিক করে যেমন পড়াশোনাও করতে হবে, তেমনি করতে হবে বিয়ে—ব্যস্ততার মাঝেই বিয়ে করে নিলেন বলে জানান তিনি। দুই সন্তানের জননীর প্রিয় রঙ সবুজ। ভালোবাসেন দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে এবং বই পড়তে। তিনি বলেন, মেয়েদের সহজেই ভেঙে পড়া যাবে না। বাধাকে বাধা ভাবলে চলবে না। তাদের আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাবলম্বী হতে হবে।
