মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব
সারা বিশ্ব বর্তমানে মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসের ভয়ে কাঁপছে। এটি দিনে দিনে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এই বিশ্বের ভাইরাস জগতে অগণিত প্রজাতির ভাইরাস বিদ্যমান। আর এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার করোনা ভাইরাস আবিষ্কৃত তথা চিহ্নিত হয়েছে। তবে সব ভাইরাস অতটা খারাপ না হলেও কিছু কিছু ভাইরাস খুবই মারাত্মক। ইতোমধ্যে করোনা প্রজাতির সর্বশেষ এই ভাইরাসের আবির্ভাব হয়েছে, এটি এখন বিশ্ববাসীর প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন স্বভাবতই একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে এর নাম করোনা ভাইরাস হলো কীভাবে? এ শব্দের পেছনে শানেনুযুল হলো—করোনা (Corona) ইংলিশ শব্দ; যা এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। আর ইংরেজি Corona-র আভিধানিক অর্থ হলো সূর্য বা চন্দ্রের চারদিকে যেমন রশ্মি ছড়িয়ে একটি প্রপঞ্চমূলক প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করে, ঠিক এই প্রজাতির অধিকাংশ ভাইরাস। সেই রকম দেখতে বিধায় এর নামকরণ করা হয়েছে ‘করোনা ভাইরাস’।
এ ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হলো সিভিয়ার অ্যাকুইট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স)। এই ভাইরাস জীবজন্তু বা মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে। যতদূর জানা যায়, তাতে প্রতীয়মান হয় যে ভাইরাসটির উত্স কোনো প্রাণী বা জীবজন্তু। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য, ভাইরাস গত বছরের (২০১৯) ৩১ ডিসেম্বরের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরের মাছ, মাংস, জীবজন্তু ও শাকসবজির একটি কাঁচাবাজারে প্রথম ধরা পড়ে। আর এটি যেনতন ভাইরাস নয়। বিগত সব ভাইরাসের থেকেও মারাত্মক ও জীবনঘাতী। এটি ধীরে ধীরে মহামারির আকার ধারণ করার অবস্থা দেখে ইতোমধ্যে জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে উক্ত ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আর চীনের আর্থসামাজিক দিক দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করছে। এক্ষেত্রে সেই মানবতাবাদী চিকিত্সক লি. ওয়েনলিয়াংওর কথা মনে পড়ে যায়। তিনিই বিগত সালের ৩০ ডিসেম্বর সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়ায় চীনা কর্তৃপক্ষ মুচলেকা নিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল। অথচ তার কথাই শতভাগ সত্য হয়। আর দুঃখের বিষয় হলো, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এই স্বনামধন্য চিকিত্সককে ১২ জানুয়ারি ২০২০-এ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সবাইকে কাঁদিয়ে অকালে চলে যান পরপারে।
যেহেতু এটি জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্ট ভাইরাসজনিত রোগ, সেহেতু এ বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার জন্য ভাইরাস-সংক্রান্ত সাধারণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক বলে মনে করি। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ল্যাটিন ভাষা থেকে এসেছে ভাইরাস (Virus) শব্দটি; যার অর্থ হলো ‘বিষ (Poison)’। এটি এমন একটি রহস্যময় বস্তু, যা না জীব, না জড়। তবে এটি উল্লিখিত দুটির মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে থাকে। ভাইরাস অকোষীয় এবং অতি আণুবীক্ষণিক ও প্রোটো-প্ল্যাজমাবিহীন রাসায়নিক পদার্থবিশেষ। তাছাড়া প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিডের সমন্বিত রূপ (Integrated) মাত্র। এর কণিকাসমূহ পরিশ্রুত (Filtered) ও কেলাসিত (Crystallized) করা যায়। ভাইরাস মাত্রই DNA/RNA অণু ও প্রোটিন দিয়ে গঠিত। ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার মতো ভাইরাসও জীবকোষ ছাড়া বাঁচে না। এটি পোষক দেহে পরজীবী রূপে বাস করে এবং এর বাইরে জড় স্ফটিক (Crystal) রূপে থাকে এবং এ ভাইরাসের পোষক হিসেবে উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্র এযাবত্ চিহ্নিত হয়েছে।
এ কথা সর্বদা সবাইকে মনে রাখতে হবে যে করোনা ভাইরাস সেই ভাইরাস, যে ভাইরাস মানব শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর, তত্পর দেখা দেয় হাঁচি এবং সঙ্গে শুকনো কাশি। আর এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট। এর পেছনে কারণ হলো, ফুসফুসে সংক্রমণ ধীরে ধীরে বেড়ে শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং একই সঙ্গে বুকে ব্যথা হয়। তবে বুকের ব্যথার ধরন একেবারেই আলাদা। কেননা, গভীর বা লম্বা শ্বাস নেওয়ার সময় বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের ওষুধ বা চিকিত্সা আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের বিষয়টি অনুসরণ তথা প্রতিপালন করা ছাড়া গত্যন্তর দেখি না। সেহেতু ঘর থেকে যখন কাজের উদ্দেশে বাইরে বেড় হতে হবে; তখন মাস্ক ব্যবহার করতে গাফিলতি করা যাবে না এবং ঘরে ফিরে এসে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে উত্তমভাবে হাত-মুখ ধুতে হবে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম বিশ সেকেন্ড ধরে পরিষ্কার করতে হবে। খামার বা গোয়ালঘর কিংবা বাজারে যেসব জায়গায় গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি থাকে, সেসব স্থান এড়িয়ে চলতে হবে। একান্ত প্রয়োজনবোধে যদি পশু-পাখি স্পর্শ করতে হয়, তখন পুনরায় ভালোভাবে হাত-মুখ পরিষ্কার করতে হবে। যা হোক, বিধি যদি বাম হয়, অর্থাত্ যদি আক্রান্ত হয়েই বসে, তাহলে বিশ্রামসহ প্রচুর পানি পান করতে হবে এবং একই সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে মুখ-গহ্বর ও গলনালি কোনো সময় যেন শুকনো না থাকে, সে ব্যাপারে সদা সচেষ্ট থাকতে হবে।
n লেখক :গবেষক
