শাহানাজ বেগম শিখা
একটা সময় ছিল যখন মেয়েরা ঘরেই বন্দি থাকত। আজ পুরুষের পাশাপাশি তারাও সমান তালে এগিয়ে চলছে। এতে পরিবার, সমাজ এবং দেশ উপকৃত হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু নরপিশাচের লালশার শিকার হচ্ছে তারা। প্রতিদিন যে পরিমাণ খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার অধিকাংশ খবর আমাদের অজানা থাকে। কারণ ভিক্টিম ও তার পরিবার লোকলজ্জার ভয়ে সেটা প্রকাশ করতে চায় না। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? সেটা জানা আমাদের এই মুহূর্তে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা কোথায়? যেখানে দুই বছরের শিশু থেকে শুরু করে মধ্যবয়স্ক নারী কেউই এদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পথে, হাটে, ঘাটে, মাঠে, বাজারে, শপিং মলে, যানবাহনে, কর্মক্ষেত্রে এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অভিভাবকরা সব সময় আতঙ্কে থাকেন। প্রতিবন্ধী, অসহায় নারী, শিশু সবাই যেন ধর্ষকদের হাতে জিম্মি। এর জন্য আমাদের বেশকিছু পদক্ষেপ এখনই নেওয়া দরকার।
প্রথমত, পরিবার থেকে শিশু শিক্ষার পথটা আরো সুপ্রশস্ত করতে হবে। অর্থাত্ শিশুকে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। নারীকে সম্মান দেখানো, নারী-পুরুষের বৈষম্য না করা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, কর্তব্য, নিষ্ঠা, সততা, ইত্যাদি সে পরিবার থেকেই প্রথম শিখবে। সাধারণত একজন মানুষ যখন অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে তার কারণ হিসেবে পরিবারের লোকজনের অবহেলা, অযত্ন ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে হয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক দায়বদ্ধতা আছে। পরিবারের পরেই এর স্থান। শিক্ষক সমাজের দর্পণ স্বরূপ। মা-বাবার চেয়েও অনেক সময় শিশুরা শিক্ষককে বেশি মানে। শিক্ষকের প্রতিটি কথা শিক্ষার্থীরা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। তাই পাঠ্যপুস্তকে এই বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠ্যসূচি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকা প্রয়োজন। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক অপরাধ চাপা পড়ে যাচ্ছে। বিচারের কার্যকর প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা দ্বিতীয়বার অপরাধ করতে পিছপা হয় না। তাই অপরাধী নয় ভিকটিমকেই নিরাপত্তাহীনতায় ঘরের কোণে বন্দিজীবন কাটাতে হয়।
চতুর্থত, নারীকে হতে হবে আত্মপ্রত্যয়ী ও নিজেকে রক্ষা করার জন্য কৌশলী। কোনো এক প্রোগ্রামে দেখেছিলাম, একজন নারী কীভাবে নিজেকে এসব নরপিশাচদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তিনি দেখিয়েছিলেন, হাতে একটি কলম সদৃশ বস্তু সব সময় রাখলে সেটা দিয়ে আক্রমণকারীর হাতে আঘাত করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়া অনেকটাই সহজ। সর্বোপরি প্রতিবাদের ভাষাটা হবে বেশ জোরালো।
তাই সমাজ থেকে এসব আবর্জনার কীট সরিয়ে ফেলতে হলে আমাদের বেকারমুক্ত, মাদকমুক্ত ও ধর্ষকমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এজন্য সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজ তথা দেশের সব অপরাধ ও অপরাধীদের শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে সাহায্য করবে। নিরাপদ হয়ে উঠবে নারীদের পথচলা।
n লেখক : সহকারী শিক্ষক, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭।
