সার্কাসের হাতিটা বাজারে প্রবেশ করেছে। দোকানিদের কাছে টাকা-পয়সা চাচ্ছে। পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকছে, শুঁড় বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকে ভয় পাচ্ছে। দূর থেকে হাতি দেখতে আপত্তি নেই; কিন্তু এহেন সাক্ষাত্ দর্শনে হূত্কম্প বন্ধ হওয়ার দশা! অতএব টাকা যায় যাক, ছেড়ে দে মা কেন্দে বাঁচি!
হাতিটা প্রত্যেক দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে শুঁড় বাড়িয়ে দিচ্ছে। কম টাকা নিচ্ছে না এবং ঝামেলা করছে। মানুষ বাধ্য হচ্ছে বড়ো নোট ছাড়তে। হাতি কিন্তু টাকা চেনে না; কার কাছ থেকে কত নিতে হবে, তাও জানে না। হাতির পিঠে বসে থাকা মাহুতের সূক্ষ্ম সংকেত অনুযায়ী হাতি মহাশয় ইয়েস অর নো করছে। প্রচণ্ড শক্তিধর বিশালদেহী প্রাণীটি এক্ষণে বন্দি, অসহায় ও আজ্ঞাবহ। মুক্ত পৃথিবী ওর জন্য নয়।
হাতিটা এসে দাঁড়াল বেচারা মুনসুর মিয়ার ‘ঠেলা মারলে পড়ে যায়’ মতো চায়ের দোকানের সামনে। এত বড়ো জন্তুটাকে দোকানের সামনে সশরীরে মূর্তিমান দেখে কিছুটা ভয়ে একটি দু’টাকার নোট বের করে দিলেন তিনি। উপর থেকে না-সূচক সংকেত পেয়ে মস্ত হাতিটা ক্ষুদ্র ‘দোয়েল’ নিতে রাজি হলো না। আরো বড়ো নোট চাই। কিন্তু বিরক্ত মুনসুর মিয়া ভিক্ষের বেশি দেবেন না। হাতিটা তার কালো লোমশ শুঁড়টা কতকটা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে মুনসুর মিয়ার খাঁচার ভেতরের ধুঁকধুঁকুনি যন্ত্রটি বরাবর এগিয়ে দিল। বেশ ভয় পেয়ে তিনি টাল খেয়ে পিছনে হটে গেলেন। আরেকটু হলে হয়তো পড়েই যেতেন। অবস্থা বেগতিক দেখে মসজিদ মার্কা পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন। কিন্তু না, মাহুতের নেগেটিভ সিগনালে এবারও ‘নো’ হয়ে গেল। আরো বেশি দিতে হবে। বাপের তালুক যেন! মুনসুর মিয়া নির্বিকার; এর চেয়ে বেশি তিনি দেবেন না। দোকানের মানুষগুলো খানিকটা দূরে সরে গিয়ে অবস্থা মানে দুরবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের সঙ্গে আছে উত্সুক ছেলেপুলের দল।
হঠাত্ হাতিটা নড়বড়ে চায়ের দোকানের দুর্বল বাঁশের খুঁটিটা শুঁড়ে পেঁচিয়ে ধরে একটু নাড়া দিল। মুহূর্তে কেঁপে উঠল পুরো দোকানঘরটা—গরিবের রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন। মুনসুর মিয়া এবার সত্যি সত্যি দারুণ ভয় পেয়ে গেলেন। রাগে মুখখিস্তি করে দশ টাকার একখানি নোট ফেলে দিলেন সামনে। হাতিটার ওপর খু-উ-ব রাগ হলো তাঁর। পরক্ষণেই রাগ পানি হয়ে যায়। জীবনে পোড় খাওয়া, পড়ন্ত বেলার মানুষটি লক্ষ করেছেন—হাতিটা চরম অপুষ্টির শিকার। দরদে উথলে ওঠে তাঁর হূদয়। বন্যেরা বনে কেন নয়? হাতিটার জন্য তাঁর খুব মায়া হয়।
