জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:০১

গবেষণা প্রতিবেদনে তথ্য
ইত্তেফাক রিপোর্ট

বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর নারীরাও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। শারীরিক, মানসিক ও যৌননিপীড়ন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখাসহ নানারকম সহিংসতার শিকার তারা। হয়রানির শিকার কর্মক্ষেত্রে, জনপরিসরে এবং গণপরিবহনে। সহিংসতাকারীদের মধ্যে তাদের নিজ জনগোষ্ঠী এমনকি পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন।

উত্তর দাতাদের মধ্যে শতকরা ৪৪ শতাংশ বলেছেন, তারা পরিবারের ভেতরে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৩৩ শতাংশ, মানসিক ৩৮ শতাংশ, অর্থনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে শতকরা ১৯ জনকে এবং পরিবারে যৌননিপীড়নের শিকার হয়েছেন শতকরা পাঁচ জন।

পরিবারে সবচেয়ে বড়ো সহিংসতাকারী ব্যক্তি স্বামী, যা সংখ্যায় শতকরা ৮২ ভাগ। পরিবারের ভেতরে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সবচেয়ে বেশি শিকার ম্রো সম্প্রদায়, ৫৯ শতাংশ। আর ত্রিপুরা নারীরা সহিংসতার শিকার ৫৭ শতাংশ। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রাঙ্গামাটিতে সবচেয়ে কম আর সবচেয়ে বেশি খাগড়াছড়িতে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও বিচার প্রাপ্তি :প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম’ শীর্ষক গবেষণা থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুন নাহার।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য বাসন্তী চাকমা। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য জেসমিন আরা বেগম। সভা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। এমজেএফের উদ্যোগে ও সিডার সহায়তায় ‘নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সুশীলসমাজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে ও জনপরিসরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে কৌশলগত উদ্যোগ শনাক্ত করা।

গবেষণায় উঠে এসেছে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শতকরা ৪৫ জন কর্মক্ষেত্র অথবা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। শতকরা ৬১ জন কর্মক্ষেত্রে (হাটবাজার ইত্যাদি) ছিলেন বেশি ঝুঁকিতে। এছাড়া ৪৫ শতাংশ বলেছে এটি ঘটেছে কৃষি কাজের মাঠে অথবা জুম খেতে।

এই গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, যেসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী অতি দরিদ্র এবং নিরক্ষর, যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ এবং কম বয়সে যাদের বিয়ে হয়েছে, তারা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি। এছাড়া মাদকাসক্তদের স্ত্রী অথবা পরিবারের সদস্যরাও এই ঝুঁকিতে থাকেন।

কর্মক্ষেত্র অথবা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার প্রধান কারণ হলো নারীর ক্ষমতাহীনতা, প্রতিবাদের অভাব, যৌননিপীড়ন প্রতিরোধে পদক্ষেপ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব। অর্ধেকের বেশি উত্তরদাতা সড়ক, যানবাহন এবং জনপরিসরে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।

অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন আদিবাসী ফোরামের সদস্য চঞ্চনা চাকমা, সাবেক সচিব সুলতানা রাজিয়া, কারিতাসের কৃষ্ণা দ্রং, একশন এইডের মরিয়ম নেসা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবায়দা নাসরিন, ডেমোক্রেসি ওয়াচের ওয়াজেদ ফিরোজ, আদিবাসী ফোরামের মনিরা ত্রিপুরা, নারী প্রগতি সংঘের সঞ্জয় মজুমদার, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রীনা রায় প্রমুখ।