অনু ইসলাম
১৯৭১ সাল স্বাধীনতাবর্ষ। ২০২০ সাল মুজিববর্ষ। একাত্তরে আমরা যারা স্বাধীনতাযুদ্ধে ছিলাম তারা কখনো অনুভব করিনি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি আছেন। প্রতিটি রণাঙ্গনে তিনি থাকতেন আমাদের অন্তরে দীপ্ত ও উদ্ভাসিত। তাঁর নামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালিত হতো। রণাঙ্গনের বাতাসে ছড়িয়ে থাকত ‘মুজিব বারুদ’। স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দাবলি কণ্ঠসুর-গানে ছিল মুজিবধ্বনি। প্রবাসের সকল দপ্তর রণাঙ্গনের নামকরণ ছিল মুজিবনগর। তার সঙ্গে ছিল মুজিববাহিনী ও অন্যান্য নিয়মিত বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী। পথেঘাটে হাটে-বাজারে লোকালয়ে মুক্ত অঞ্চলে পোস্টার-লিফলেট-ব্যানারে জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর ছিলেন দীপ্তি অশরীরী পদচারণায়।
বাংলাদেশ বেতার ধারাবাহিক ইতিহাসে একটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও প্রবাসী সরকার পার করে আজকের এই বেতার।
মুক্তিযুদ্ধে ছিল সশস্ত্র ফ্রন্টের প্রণোদন-শক্তি। এই সমরশক্তি উজ্জীবিত করতে কথিকা, রচনা, গান, নাটক ইত্যাদি যেমন ছিল তেমনি ছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা ও স্বাধীনতায় উজ্জীবিত করার ‘বজ্রকণ্ঠ’ অনুষ্ঠান।
আজ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের দোরগোড়ায় এসে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর সঙ্গে শত যোজনে একত্রিত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সমৃদ্ধি-উন্নয়নের পথে বেতার পরিকল্পনাবিদদের বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে।
আজ বিশ্ব বেতার দিবস নিছক একটি উদযাপনের তারিখ হিসাবে গণ্য করা ঠিক হবে না। এই দিনটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—বেতারের মাধ্যমে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা।
স্বাধীন বাংলা বেতারের অভূতপূর্ণ সাফল্যের পিছনে ছিল প্রতিটি কর্মীর দৃঢ় অটুট কঠিন মনোবল। সে সময় আমাদের বয়স ছিল কমবেশি পঁচিশ। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। পেছন ফেরার কোনো পথ নেই। আমাদের সামনে মৃত্যু, পেছনে মৃত্যু। পেছনের পথ পলায়নের, যে পথ মৃত্যু কাপুরুষের। সামনের সমরে মৃত্যু গৌরবের—শহিদের। আমি অনেক মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে অজপাড়াগাঁয়ের তরুণকে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। শুধু অপেক্ষা—কখন অস্ত্র তুলে দেবে লিডার। বিলম্বে ডাক পাওয়া তাদের কাছে ছিল প্রচণ্ড অস্থিরতা-অভিমানের।
বিশ্ব বেতার দিবসে মনে পড়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের সেইসব সাহসী শত শব্দসৈনিকের দৃঢ় প্রত্যয়, পরিকল্পনা, সুদুরপ্রসারী চিন্তাচেতনা ও ভাবনা। প্রতিটি অক্ষরকে শব্দ বানিয়ে একটার পর একটা বাক্য গুছিয়ে বারুদে রূপ দিয়ে ইথারে ভাসিয়ে শত্রুর ছাউনির ব্যারাকে বিষ্ফোরণ ঘটানো হতো।
শত্রুপক্ষ পাকিস্তানি নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি গেরিলা আক্রমণ ছিল দুর্ভেদ্য। এসব কর্মপরিকল্পনা এবং সফলতা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত প্রচারণায় একদিকে যেমন অধিকৃত দেশে জনগণের মনকে চাঙ্গা করেছে তেমনি ঘাত-প্রতিঘাতে ক্রমেই পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনী।
মুক্তিযুদ্ধের এই ছিল বিজয় কাহিনি।
আজ কুড়ি-বিশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশ স্বাধীন। জাতির পিতা স্বাধীনতার স্থপতির শতবর্ষে আজ বঙ্গবন্ধু দেদীপ্যমান। স্বাধীন বাংলাদেশের পথ ধরে আসছে স্বাধীনতার অর্ধশত বছর দুয়ারে অপেক্ষমাণ আরেকটি সাফল্যের কাহিনি।
বিশ্ব বেতার দিবসে আমাদের বেতারের ইতিহাস ঐতিহ্য ও গৌরবজনক অধ্যায়কে স্মরণ করি। মুজিববর্ষে বেতারের সকল আঞ্চলিক কেন্দ্র, সরকারি এফ এম, প্রাইভেট এফ এম ও কমিউনিটি রেডিও-র পরিকল্পনা এমন করে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন যেমন করে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ দীক্ষায় বাঙালিরা একাত্তরের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যেমন করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১০ জানুয়ারিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম দেশ গড়ার সংগ্রাম’; তেমনি দেশব্যাপী বর্তমান সরকারের উন্নয়নের বেগকে স্রোতস্বিনী বহমান সাগরে পরিণত করার কর্মকাণ্ড এবারের সংগ্রাম উন্নয়নের সংগ্রাম হিসাবে চালাতে হবে বেতারে। তবেই সফল হবে বেতার দিবস পালনের সার্থকতা।
