করোনার বৈশ্বিক প্রভাব এবং আমরা

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২৭

করোনা আতঙ্কে কাঁপিতেছে বিশ্ব, বলিলে খুব বেশি অত্যুক্তি হইবে না। করোনার জ্ঞাতি ভাইরাস সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনন্ড্রোম) ১৭ বত্সর পূর্বে গোটা বিশ্বে ৭৭৪ জনের প্রাণ কাড়িয়াছিল। সার্সের তুলনায় শতকরা হিসাবে করোনায় মৃত্যুহার অনেক কম হইলেও এই ভাইরাসটি পঙ্গপালের মতো বিস্তার ঘটাইতে পারে। ফলে ডিসেম্বরে চীন হইতে ভাইরাসটি মাত্র আড়াই মাসে বিশ্বের ৩০টি দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইতোমধ্যে মৃত্যু ছাড়াইয়াছে হাজারের কোটা। মৃত্যুর মাপকাঠিতেই শুধু নহে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গভীর ক্ষত সৃষ্টি করিতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করিতেছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, গত ১৭ বত্সরে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অংশীদারিত্ব বহুগুণ বাড়িয়াছে। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতি, বিশ্বের সবচাইতে বড়ো পণ্য রপ্তানিকারী দেশ। ফলে, নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীনের অর্থনীতি যতটা ধাক্কা খাইবে, ততটাই প্রভাব পড়িবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইতোমধ্যেই করোনার কারণে ফোক্সওয়াগন, টয়োটা, ডেইমলার, জেনারেল মোটরস, রেনো, হোন্ডা, হুন্দাই প্রভৃতি প্রথম সারির গাড়ি তৈরির কোম্পানিগুলি তাহাদের চীনের কারখানা বন্ধ করিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছে। হুন্দাই তো কোরিয়াতেও তাহাদের বৃহত্ কারখানাটি বন্ধ করিয়া দিয়াছে।

করোনার মধ্যে রাজনৈতিক গন্ধও খুঁজিয়া পাইতেছেন অনেকে। করোনা সংক্রান্ত গুজবও পাল্লা দিয়া বাতাসে ভাসিতেছে। এখন অবধি যত মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হইয়াছেন তাহাদের ৯৯ শতাংশই চীনের বাসিন্দা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করিতেছেন, প্রকৃত আতঙ্ক লুকাইয়া রহিয়াছে বাকি ১ শতাংশে! কারণ, চীনের বাহিরের এই ১ শতাংশ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়াইয়া রহিয়াছেন। প্রতিনিয়ত তাহাদের হইতেই এই ভাইরাস ছড়াইয়া পড়িতেছে অন্যের শরীরে। হংকংয়ে সার্সের শীর্ষ পর্যায়ের গবেষক গ্যাব্রিয়েল লিউং আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনিতে না পারিলে আগামী দিনে বিশ্বের ৬০ শতাংশ মানুষই এই ভাইরাসের নাগালের মধ্যে চলিয়া আসিতে পারে! সাধারণভাবে যদি ধরা যায় একজন আক্রান্তের শরীর হইতে এই ভাইরাস গড়ে দুইয়ের বেশি মানুষের শরীরে ছড়াইয়া পড়িতেছে, তাহা হইলেই বোঝা যাইবে আক্রান্তের সংখ্যা কতটা বিপুল হইতে পারে। সার্সের তুলনায় কেবল একটাই স্বস্তি, এই ভাইরাসে মৃত্যুর হার অনেক কম, মাত্র ১ শতাংশ। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা যদি বিপুল হয় তাহা হইলে মৃতের সংখ্যা বিপুল হইতে বাধ্য। ইহাও বড়ো আতঙ্কের। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভাইরাসটির বিস্তার আটকাইতে চীন যেইভাবে কড়া পদক্ষেপের পথে হাঁটিয়াছে, বাকিদেরও তাহাই করিতে হইবে। যদিও এই পদ্ধতিতে ভাইরাসকে আদৌ আটকানো সম্ভব কি না, তাহাও নিশ্চিতভাবে বলিতে পারিতেছেন না কেহ। এই ধোঁয়াশাও আতঙ্ককে আরো বাড়াইয়া তুলিতেছে।

করোনার প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কার লইয়া যত কথা শুনা গিয়াছে, বাস্তবতা তাহা অপেক্ষা অনেক দূর বলিয়া মনে করেন বেশির ভাগ চিকিত্সাবিজ্ঞানী। এমতাবস্থায় আমাদের মতো অত্যন্ত জনবহুল দেশে করোনা ভয়ংকর হইয়া দেখা দিতে পারে। সরকার এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে বটে,  কিন্তু এই ক্ষেত্রে তিলমাত্র অবহেলা বা উদাসীনতার কোনো সুযোগ নাই।