বর্তমানে আমাদের বসবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে। এই সময়ে আমাদের প্রথাগত সম্পর্কের নানা সমীকরণ ভীষণভাবে পরিবর্তিত হইয়া যাইতেছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগের ধরন যেমন পালটাইয়া গিয়াছে তেমনি পালটাইয়া গিয়াছে সামাজিক যোগাযোগের সূত্র। মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির ধরনেও পরিবর্তন আসিয়াছে। প্রথাগত সংবাদপত্রের জায়গা দখল করিয়া লইতেছে নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ইহাতে তথ্যের চলাচল যেমন অবারিত হইয়াছে তেমনি নষ্ট হইয়াছে সংবাদসূত্রের বিশ্বস্ততা। আমাদের টাইমলাইন, নিউজফিড ভরিয়া যায় প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় সংবাদ, ছবি ও ঘটনায়। এই সুযোগটি করিয়া দিয়াছে ইন্টারনেট। সারা বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযুক্ত রহিয়াছে। তরুণদের মধ্যে এই হার আরো বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে যাহারা ইন্টারনেট ব্যবহার করিয়া থাকে তাহাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের রহিয়াছে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেসবুক আমাদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও ব্যক্তি মানসের উপরও তাত্পর্যপূর্ণ প্রভাব ফালাইতেছে। বর্তমানে প্রযুক্তির যে দুয়ার উন্মুক্ত হইয়া গিয়াছে তাহা আর বন্ধ করিবার উপায় নাই। নানা ইতিবাচক ও নেতিবাচক অনুষঙ্গ সঙ্গে লইয়াই তাহা আমাদের জীবনের অংশ হইয়া উঠিবে ক্রমশ। সম্প্রতি রাজধানীতে ‘নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস ২০২০’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা এই বিষয়ে তাহাদের মতামত ব্যক্ত করিয়াছেন। তাহারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ফেক বা ভুয়া আইডি খোলা অপরাধ। ইহাছাড়া ক্ষতিকারক বিষয়ে (মন্তব্য, সংবাদ, ছবি, ভিডিও, অডিও) প্রকাশ করা এবং ইহাতে মন্তব্য, শেয়ার কিংবা লাইক দেওয়াও অপরাধ। এইসব করিলে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব।
একদিকে যেমন মানুষের মত প্রকাশের অধিকার রহিয়াছে, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রহিয়াছে গুজব ও মিথ্যা সংবাদের বিস্তার রোধ করা। সেই লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখিয়াছি ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়াইয়া দেওয়ার কয়েকটি ঘটনা। সহজেই ফেক আইডি খুলিয়া বা অ্যাকাউন্ট হ্যাক করিয়া বড়ো ধরনের সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা অসম্ভব নহে। এইগুলি বন্ধ করিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রহিয়াছে। তবে জটিলতাও আছে। আমরা জানি, ফেসবুকে ইমেইল অথবা মোবাইল নাম্বার দিয়া আইডি খোলা যায়; আমাদের দেশে সাধারণত মোবাইল নাম্বার দিয়া অধিকাংশ আইডি খোলা হইয়া থাকে। সেইক্ষেত্রে মোবাইল নাম্বার বা সিম ক্রয় করিতে যেহেতু জাতীয় পরিচয়পত্র লাগে সেহেতু সেইসূত্রে সহজেই ঐ ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব; কিন্তু যত্রতত্র সিম বিক্রয়, সিম ক্লোন করা তো বন্ধ হয় নাই। পাশাপাশি একটি ন্যূনতম বয়সের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার আইনসঙ্গত নহে; কিন্তু আমরা অনেক কমবয়সিদের ফেসবুক ব্যবহার করিতে দেখি। আমাদের সরকার চাহিতেছে ইহা ১৮ বত্সর করিতে। সেইক্ষেত্রে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সহিত সরকারকে বোঝাপড়া করিতে হইবে। প্রযুক্তি অনেক দিক দিয়া আমাদের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ; কিন্তু ইহার কিছু নেতিবাচক দিকও রহিয়াছে। তাই একটি নিয়ন্ত্রণ আর নজরদারির ব্যবস্থা থাকাও প্রয়োজন।
