অতীতের কৃষি, বর্তমান কৃষি

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২৮

ড. এজাজ মামুন

বাংলাদেশ অনাদিকাল থেকে শস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত হলেও প্রায় সব সময়ই কৃষকরা ছিলেন অবহেলিত। বর্গী বলি আর বিদেশি শাসকই বলি, সবার লোভ-লালসা ছিল কৃষকের সম্পদের ওপর। শোষকরা শতাব্দীর পর শতাব্দী উত্পাদিত পণ্য হরণ আর অধিক খাজনার ভার চাপিয়ে কৃষককে শোষিত করেছে, আর তাদের জীবনকে করে তুলেছিল দুর্বিষহ। আর এর ওপরে ছিল বিরূপ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা আমাদের কৃষিব্যবস্থাকে অনাদিকাল থেকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ব্রিটিশদের শোষণ থেকে মুক্তি এলেও আমাদের কৃষকদের ভাগ্যের কোনো উন্নতি হলো না। খাদ্য উত্পাদনেও তেমন অগ্রগতি হলো না। এর ফলে ১৯৫০ সালের ৫ লাখ টন খাদ্যঘাটতি বেড়ে ষাটের দশকের শেষের দিকে তা হলো ১৫ লাখ টন। পাকিস্তানিদের বৈষম্য, শোষণ আর নির্যাতনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির প্রতি অবহেলার কারণে কৃষক ও কৃষি উত্পাদন অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়ল। তার পর উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ একদিকে কৃষি ও কৃষককে বিপর্যস্ত করল অন্যদিকে খাদ্য উত্পাদনও ব্যাহত হলো সাংঘাতিকভাবে। পর পর ১৯৬৮, ১৯৬৯ এবং ১৯৭০ সালের বন্যায় খাদ্য ঘাটতি চরমে পৌঁছাল। ১৯৭০ সালে খাদ্যঘাটতি দাঁড়াল ২২ লাখ টনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনী  আর তার দোসররা বাংলাদেশকে এক মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করল। কৃষি কাজ ব্যাহত হলো, ১৪ হাজার বর্গমাইলেরও বেশি জমি অনাবাদি থাকল। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরা হালের বলদ, দুধের গাভিসহ সব গবাদি পশু জবেহ করে নিজেদের উদর পূর্তি করল, রসনা মিটিয়ে কৃষকদের নিঃস্ব করে দিল। সহায়-সম্বলহীন কৃষকদের হাল চাষ করার মতো গবাদি পশুও রইল না। তার পর পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হওয়ার আগ মুহূর্তে সরকারি গুদামে মজুত খাদ্যশস্য, বীজ, সার, কৃষি উপকরণ ধ্বংস করে দিল। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে দেশের খাদ্যঘাটতি দাঁড়াল ৪০ লাখ টনে। বঙ্গবন্ধু, যার প্রাণের প্রতিটি স্পন্দন কৃষক-শ্রমিকের জন্য নিবেদিত, যাদের সুখী জীবন যার স্বপ্ন, তিনি মুক্ত স্বাধীন দেশে এসেই কৃষির এই বীভত্স চিত্র দেখে দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য প্রথম পদক্ষেপটি নিলেন কৃষি উন্নয়নের এক দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে। তিনি জানতেন দেশের কৃষির ওপর নির্ভরশীল ৮৫ শতাংশ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে বাংলাদেশকে সোনার বাংলাদেশে পরিণত করা সম্ভব। ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’—এ স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দিলেন। মুক্তিযুদ্ধে নিঃস্ব হওয়া ২২ লাখেরও বেশি কৃষি পরিবারকে পুনর্বাসন করলেন। ভূমি উন্নয়ন ও উন্নত সেচ কার্যক্রম গ্রহণ করে এক ফসলা আবাদি জমিকে বহু ফসলায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিলেন। বিধ্বস্ত দেশের কৃষি পুনর্বাসনের মতো কঠিন কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তিনি কৃষি খাতকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করলেন। কৃষিকে নিয়ে মহাপরিকল্পনা আর কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সঙ্গে যারা কৃষির উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে পারেন, বঙ্গবন্ধু তাদের কথাও ভাবলেন। ইতিহাসে স্মরণীয় একটি দিন ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এলেন বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর সমবেত সুধীজনের উদ্দেশ্যে সেদিন তিনি বলছিলেন, ‘সোনার বাংলার নাম আজকের সোনার বাংলা নয়—বহু দিনের সোনার বাংলা। বাংলার মাটির মতো মাটি দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া যায় না—বাংলার সম্পদের মতো সম্পদ দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। সেজন্য শোষকের দল বারবার বাংলার ওপর আঘাত করেছে এবং তারা তাদের শক্তি দিয়ে বাংলাকে দখল করে রেখেছে।’ তিনি খুব সহজ করে সেদিনের শিক্ষার্থী কৃষিবিজ্ঞানীদের জীবন গড়ার বড়ো শিক্ষার কথা বলেছিলেন, ‘শুধু কাগজে-কলমে আর বই পড়েই কৃষিকাজ হয় না। ছোট ভাইয়েরা তোমরা মনে কিছু করবে না। বই পড়ে তোমরা যা শিখ, গ্রামে যারা অর্থাত্ বুড়া কৃষকরা নিজের অভিজ্ঞতায় কম শেখে না। যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, এই জমিতে কী লাগবে, কতটুকু সার লাগবে—সে নির্ভুল বলে দিতে পারবে। তোমরা পাঁচ বছর বই পড়ে যা শিখবে না, তার কাছে দেখো উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাবে। বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটু প্রাকটিক্যাল কাজ করতে হবে। প্যান্ট-শার্ট-কোট একটু খুলতে হবে। তা না হলে বিপ্লব করা যাবে না।’ বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ভাষণের প্রতিটি পঙিক্ত ছিল কৃষিকে নিয়ে সামনে চলার অনুপ্রেরণা আর দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু সেদিন কৃষিকে নিয়ে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যয় জানাবার সঙ্গে সঙ্গে, কৃষিবিদদের পেশাকে আলোকিত করলেন যথাযথ মর্যাদা দিয়ে। কৃষিবিদদের প্রতি বঙ্গবন্ধু এই অমূল্য উপহার শুধু তার প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞতা জানাবার সুযোগ করে দেয়নি বরং দেশের উন্নয়নে কৃষিবিদদের সর্বাগ্রে যাওয়ার পথ করে দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন কিষাণ-কিষাণি আর শ্রমজীবী মানুষ বাংলাদেশের প্রাণশক্তির চাবিকাঠি। আর তাই কৃষি, কিষান-কিষানি আর শ্রমজীবী মানুষের মঙ্গলই ছিল তার রাজনৈতিক জীবন অন্যতম দর্শন। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের যুগান্তকারী কর্মযজ্ঞের এক অনবদ্য স্থপতি, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আগে এ ভূখণ্ডে এমন কেউ জন্মাননি, যিনি কৃষিকে নিয়ে এতটুকু ভেবেছেন, কৃষিকে এত গভীরভাবে ভালো বেসেছেন। সেদিনের বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী কৃষিবিদেরা ও কৃষি পেশাজীবীরা যে যাত্রার শুভ সূচনা করেছিল আজ প্রায় পাঁচ দশক পরে কৃষির অনন্য উন্নতি সেই যাত্রাকেই সাফল্যমণ্ডিত করেছে।

n লেখক : প্রবাসী কৃষিবিজ্ঞানী