বিভক্ত ও রক্তাক্ত সিরিয়ায় কি তবে শান্তি পরাহত!

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২৮

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

২০১১ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে নানা আন্তর্জাতিক সমীকরণ যুক্ত হয়েছে। ফলে সিরিয়ার পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। ৯ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে লক্ষাধিক লোক নিহত হয়েছে আর বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হয়েছে ৬০ লাখ সিরিয়ান। সিরিয়ার এই যুদ্ধে বাশার আল আসাদকে শক্ত সমর্থন দিয়ে আসছে রাশিয়া, ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গেরিলা গোষ্ঠী। বিরোধী পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরাইল, সৌদি, তুরস্ক ও কাতার। প্রত্যেকটা দেশ ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থে যুক্ত হওয়ায় সিরিয়া এখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কুর্দি যোদ্ধা ও আইএস যুক্ত হয়ে সিরিয়া সংকটকে জটিল করেছে। সিরিয়ার ৭৫% মানুষ সুন্নি (৫% কুর্দিসহ) আর বাকি ২৫% আলাওয়াসি। এই আলাওয়াসি সম্প্রদায়ের লোক প্রেসিডেন্ট আসাদ। মূলত আলাওয়াসি সম্প্রদায়ের লোক সিরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে নানা ক্ষোভ থেকে ২০১১ সালে আন্দোলন শুরু হলে একসময় সুন্নিরা প্রবাসী সরকার ও ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মি’ নামে সামরিক বাহিনী গঠন করে। মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্তের কট্টর সমর্থক তুরস্কে খোলা হয় সেই প্রবাসী সরকারের শাখা। সিরিয়ার ওপর দিয়ে তুরস্ক পর্যন্ত  তেলের পাইপলাইন নির্মাণ করতে গিয়ে আসাদের অনুমতি না পাওয়া কাতারও যোগ দেয় বিদ্রোহীদের পক্ষে। যেহেতু আসাদ রাশিয়া ও ইরানের বন্ধু ফলে বিদ্রোহীদের সাহায্যে এগিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরাইল ও সৌদি আরব। বিরোধীরা বড়ো একটি আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থন পেয়ে যায়। কিন্তু তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যুদ্ধে জড়িয়ে যায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস ও কুর্দি যোদ্ধারা। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে বিশাল এলাকা দখল করে ফেলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব বাশার বিরোধী হলেও আইএসের পতন চায়। কুর্দিরা বাশার বিরোধী কিন্তু তারা স্বাধীন কুর্দিস্থান চায়। কিন্তু আসাদ বিরোধী তুরস্ক আবার কুর্দি বিরোধী। এসব সমীকরণে বাশার বিরোধীদের ঐক্যে ফাটল ধরে। ফলে যুদ্ধে আইএসের পতন হলেও বাশার আল আসাদ আরো শক্তিশালী হয়। পিছু হটতে হয় মার্কিন-সৌদি বলয়কে।

তবে সিরিয়ায় এখনো যুদ্ধরত রয়ে গেছে তুরস্ক ও রাশিয়া। রাশিয়ার এসএস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় করে তুরস্ক-রাশিয়া কাছাকাছি আসলেও লিবিয়া ও সিরিয়া দুই দেশ মুখোমুখি। তুরস্ক আসাদকে দমাতে না পারলেও কুর্দিদের দমাতে চায়। তুরস্কের আশঙ্কা তার সীমান্ত ঘেঁষে সিরিয়ায় বাস করা স্বাধীনতাকামী কুর্দিরা যদি তুরস্কে বাস কুর্দিদের সঙ্গে একজোট হয় তবে তার মানচিত্রে ভাঙন ধরবে। অন্যদিকে রাশিয়া চায় সিরিয়ার তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ। সমাধানকল্পে ২০১৭ সালে রাশিয়া, ইরান ও তুরস্ক কাজাখস্তানের রাজধানী নূরে সুলতানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে একমত হয়। তিন দেশই সামরিক সমাধান থেকে সরে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে সম্মত হয়েছে।

কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না। সিরিয়ার ইদলিব হচ্ছে একটি জটিল জায়গা। জঙ্গলবেষ্টিত এই অঞ্চল গেরিলা যোদ্ধায় ভরপুর। তুরস্ক এখানে ১২টি পর্যবেক্ষক পোস্ট মোতায়েন করে রেখেছে। আলেপ্প শহরের কাছাকাছি ইদলিব সিরিয়া সরকার ও রাশিয়ার জন্য স্পর্শকাতর। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া ও তুরস্কের ইদলিব নিয়ে শান্তি চুক্তি হয়। কম ঝুঁকিপূর্ণ রাখতে হামলা নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু তবুও পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে ১১ লাখ লোক গৃহহীন ও ১ হাজার ৩০০ বেসামরিক লোক নিহতের খবর পাওয়া গেছে। চলতি বছরের শুরুতে তুরস্ক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও এই মাসে ইতিমধ্যে কয়েকবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে সিরিয়ান ও তার্কিশ আর্মি। এই সংঘর্ষে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয় তাদের সামরিক বাহিনীর ওপর হামলার কারণে সিরিয়া সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান বাধাগ্রস্ত হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই ধরনের সামরিক উত্তেজনার ফলে ভেস্তে যেতে পারে সিরিয়া নিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পরিকল্পনা। ফলে আরো দীর্ঘায়িত হবে সিরিয়া সংকট। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তুরস্ক ও রাশিয়া কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি না। উদীয়মান মুসলিম পরাশক্তি তুরস্ক নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশ থেকে হাত গুটিয়ে চলে যেতে চায় না। অন্যদিকে ইরান-রাশিয়া জোট ইরান থেকে ইরাক, সিরিয়া হয়ে লেবানন পর্যন্ত তাদের শক্তি সঞ্চার করতে চায়। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনা চলাকালে সামরিক শক্তির প্রদর্শন আলোচনাকে প্রভাবিত করবে। সিরিয়ায় শান্তি ফিরাতে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। নুরে সুলতান ঘোষণার রাজনৈতিক সমাধানে ফিরতে দুই পক্ষকে অস্ত্রবিরতিও মেনে চলতে হবে।

n লেখক:  শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়