বৈশ্বিক উন্নয়নের এই যুগে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর বিরূপ প্রভাব বিশ্বব্যাপী একটি বড়ো উদ্বেগের বিষয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উষ্ণতা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকায় প্রাক্-শিল্প সময়ে প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওপরে উঠে যায়। অন্যদিকে, বৈশ্বিক স্তরে সাগর-বরফ হ্রাস পায় ৪.১৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার; যা এযাবত্কালের রেকর্ডে থাকা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। একদিকে উষ্ণতা বৃদ্ধি অন্যদিকে হিমায়িত সমুদ্রাঞ্চল হ্রাস জলবায়ুর ওপর সৃষ্টি করছে মারাত্মক চাপ। ভূমিকম্প, সুনামি, উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় এবং বন্যা সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ বার্ষিক গড়পড়তা শত শত বিলিয়ন ডলার। কেবল দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্যই দরকার হবে বার্ষিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো, যার যোগান কোনো সহজ কাজ নয়। এ কারণেই জলবায়ুর পরিবর্তন রোধ ও ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য বিশ্বব্যাপী ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০’ এ গৃহীত হয়েছে এসডিজি-১৩। যার উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এসডিজি-১৩ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব উপশমনের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর প্যারিস চুক্তিতে প্রাপ্ত উদ্যোমকে সুসংহত করার কথা বলা হয়েছে। জলবায়ুসংক্রান্ত বিপদ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ দমনে দৃঢ়তা তৈরিকল্পে শক্তিশালী প্রচেষ্টারও প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ উপশমে সাহায্য করার জন্য ২০২০ নাগাদ প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার আহরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ফাণ্ডের মাধ্যমে জলবায়ু সম্পর্কিত দুর্যোগ উপশমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য করা হবে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কৌশল বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে। ২০১৪-১৫ সালে অধিকাংশ দেশের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী মূল ঝুঁকি উপাদান উপশমে বড়ো ভূমিকা রেখেছে পরিবেশ প্রভাব পর্যালোচনা, সংরক্ষিত এলাকা নিয়ে আইন, জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প, কর্মসূচি এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকিপ্রবণ একটি দেশ। এই দেশ সাধারণত যে সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয় তার মধ্যে আছে নদীভাঙন, সাইক্লোন, খরা, টর্নেডো, শৈত্যপ্রবাহ ইত্যাদি। এ সকল দুর্যোগ জলবায়ুজনিত ঘটনাগুলোর পুনঃপুন সংঘটন ও প্রবলতা ব্যাপক বৃদ্ধি করতে পারে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরাট প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। চরমমাত্রার তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্রতর বন্যা, খরা এবং বঙ্গোপসাগরে বিরাজমান উত্তাল আবহাওয়া এখন প্রায়ই নিয়মিত ঘটনা। বড়ো ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিও রয়েছে বাংলাদেশের। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হবার ফলে মানুষের জীবন ও জীবিকায় ঝুঁকি ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবিলায় সরকার গৃহীত কর্মসূচির একটি হলো ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসপি)’। এর আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রধান জাতীয় পরিকল্পনা যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। বিসিসিএসপি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটা সার্বিক নির্মাণ কাঠামো প্রস্তুত করে এবং উন্নয়ন অর্জনে সরকারি প্রতিশ্রুত পথ সম্পর্কে ধারণা দেয়। বিসিসিএসপি হলো এমন একটা কৌশল যা পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লক্ষ্য একই রেখায় আনার একটা সূত্র হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে মোট ৪৪টি কর্মসূচি এবং ১৪৫টি পদক্ষেপ ছয়টি বিষয়বস্তুগত জায়গায় স্থান দেওয়া হয়েছে। বিষয়বস্তুগত দিকগুলো হলো: (১) খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য; (২) বিস্তৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা; (৩) অবকাঠামো; (৪) গবেষণা ও জ্ঞান ব্যবস্থাপনা; (৫) উপশমন ও কার্বনের নিম্ন নিঃসারণ এবং (৬) সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধি। নরওয়ের সরকারের সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশে ২০১৫ সালে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার (এনএপি) একটা রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে। এনএপি প্রক্রিয়া সম্পন্নকল্পে যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি, একটি কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিসহ এনএপি সূত্রবদ্ধকরণের নিমিত্ত একটা প্রধান দল গঠন করা।
জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলা করে এসডিজি ১৩ অর্জনে সরকারের অন্যতম আরেকটি কর্মসূচি হলো ‘জলবায়ুর পরিবর্তন এবং লিঙ্গভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (সিসিজিএপি) ২০১৩।’ এর অন্তর্নিহিত নীতি হচ্ছে রূপান্তরযোগ্য লিঙ্গভিত্তিক হস্তক্ষেপ। সিসিজিএপি তৈরি করতে গিয়ে একটা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল দেশের ভেতর সভা এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময়। এগুলোতে অংশ নেয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/সরকারি বিভাগের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রকাশনা, ওয়েবসাইট, সমীক্ষা এবং মুখোমুখি সাক্ষাত্কার এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমান সরকারই প্রথম দেশে Climate Change Trust Act 2010 প্রণয়ন করে এবং আইনে পরিণত করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব উপশমন করা।
এসডিজি ১৩র লক্ষ্যসমূহ অর্জনে শেখ হাসিনা সরকারের আরেকটি কর্মসূচি হলো: Intended Nationally Determined Contributions (আইএনডিসি)। আইএনডিসির মূল কাজ অভিযোজন ও উপশমন কৌশল সাজিয়ে জলবায়ু অভিজাতসহনীয় করে তোলা। বাংলাদেশের উপশমন কৌশল বিদ্যুত্, পরিবহন ও শিল্পখাত কেন্দ্রিক। ‘যেমন আছে তেমন অবস্থায় ২০৩০ নাগাদ এই খাতগুলো থেকে নির্গত জিএইচজি (GHG) মোট নির্গমনের ৬৯ শতাংশ হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। কেবলমাত্র অভ্যন্তরীণ উত্স ব্যবহার করে ২০৩০ নাগাদ এই খাত থেকে জিএইচজি নির্গমন মাত্রা ৫ শতাংশ হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর যদি উন্নত দেশ থেকে যথাযথ পরিমাণে যথাসময়ে সহযোগিতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে হ্রাসের লক্ষ্য ১৫ শতাংশ। এছাড়া এরই মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় ‘নির্মল বায়ু আইন, ২০১৯’ একটি আইনের খসড়া করেছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ নিম্নোক্ত দুটো প্রকল্পের জন্য Green Climate Fund (জিসিএফ) থেকে অর্থায়ন পেয়েছে। একটি হলো ‘বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন রান্না কর্মসূচি’। এর উদ্দেশ হলো উন্নত চুলা অভিযোজনে টেকসই বাজার সৃষ্টিতে প্রতিকূলতা দূরীকরণ। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ পল্লি অঞ্চলে বাস করে যেখানে রান্না-বান্না করা হয়ে থাকে প্রধানত প্রথাগত জ্বালানি (যেমন :কাঠ, খড়, পাটকাঠি) ব্যবহার করে। রান্নার জন্য কাঠ পোড়ালে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। নির্গত হয় মিথাইল ও ব্ল্যাক কার্বন। এই প্রক্রিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব হিসেবে বনায়ন ব্যাহত হয় ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এসব কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রাণহানিসহ প্রায় ৫৬ হাজার দুর্ঘটনা ঘটে। বর্তমানে দেশের মাত্র তিন-চার শতাংশ খানা উন্নীত চুলা ব্যবহার করে। উন্নীত চুলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা শুধু পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য নয়; এতে করে বিদ্যমান সাপ্লাই চেইন যেমন বিস্তৃত হবে তেমনি বৃদ্ধি পাবে চাহিদাও।
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে অর্থায়ন পাওয়া দ্বিতীয় প্রকল্প হলো ‘জলবায়ু-প্রসূত লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলের বিশেষত নারীদের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি’। উপকূলীয় এলাকার জনগণ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন—সাইক্লোন, উত্তাল সমুদ্র এবং সমুদ্র স্তর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে। ইদানীং এগুলো আরো প্রবলতর হচ্ছে। এই সমস্ত দুর্ঘটনার সূত্রে উপকূলীয় মিঠাপানিতে প্রচুর পরিমাণে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যদি অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়, তা হলে মিঠাপানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব হ্রাস পাবে এবং একই সঙ্গে উপকূলীয় জনপদে যারা ঝুঁকিতে আছেন তাদের ক্ষেত্রে দুর্লভ সুপেয় পানির প্রাপ্তি ঘটবে। এরই মধ্যে জলবায়ু সহনশীল পানি সরবরাহ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা কম্যুনিটি ভিত্তিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রকল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; যার মধ্যে জিসিএফ মঞ্জুরির পরিমাণ ২৪ মিলিয়ন ডলার।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ শিল্পোন্নত দেশ থেকে অভিযোজন সম্পর্কিত অর্থায়ন প্রত্যাশা করছে। কারণ এ দেশে অভিঘাত সহনশীল কাঠামো নির্মাণ করতে হলে ভবিষ্যতে প্রচুর অর্থায়নের প্রয়োজন পড়বে। শিল্পোন্নত দেশগুলো এ ক্ষেত্রে হতে পারে বাংলাদেশের অংশীদার ও প্রয়োজনীয় অর্থের উত্স। কিছুদিন আগে স্থাপিত Green Climate Fund প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং জলবায়ু সংক্রান্ত নীতিগুলোকে মূলস্রোতে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে।
বর্তমানে জলবায়ুগত বিভিন্ন বিপর্যয় ও দুর্যোগের কারণে প্রতি ১ লাখে মৃত ও নিখোঁজ মানুষসহ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৮৮১ জন। এই সংখ্যা কমিয়ে ২০২০ ও ২০৩০ সালের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৬ হাজার ৫০০ ও ১ হাজার ৫০০ জন। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এযাবত্কালের গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তেমন কঠিন কিছু নয়। এ লক্ষ্য অর্জনে বেশি সহায়ক হবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কৌশল (২০১৬-২০২০); যা সেন্ডাই নির্মাণকাঠামো ধরে তৈরি করা হয়েছে। বিগত আট বছরে বিসিসিটিএফ এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনে বাংলাদেশ প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। এরই মধ্যে বিসিসিএসএপি সংশোধন ও এনএপির প্রস্তুতিপর্ব বিবেচনাধীন আছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নও আসছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জিসিএফ তহবিল থেকে দুটো প্রকল্পের জন্য মঞ্জুরি পেয়েছে। মোট কথা, জলবায়ুজনিত সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন বেশ ভালোভাবে প্রস্তুত আছে সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
n লেখক :পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
