টাইমস নাউকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের মাটি থেকে জঙ্গি তত্পরতা চালাতে দেওয়া হবে না

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:১০

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মাটি থেকে কোনো ধরনের জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশের মাটি প্রতিবেশী দেশে জঙ্গি হামলার ঘাঁটি হবে না। কারণ জঙ্গিবাদকে সমর্থন দিলে আমাদের জনগণকেও আক্রান্ত হতে হবে। ভারতীয় সম্প্রচার মাধ্যম টাইমস নাও-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। শনিবার সম্প্রচারিত ওই সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক, তিস্তার পানিবণ্টন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। সাক্ষাত্কারটি নেন টাইমস নাও-এর জাতীয় বিষয়ক সম্পাদক সৃঞ্জয় চৌধুরী।

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কোনোভাবেই চাই না বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে কোনও প্রতিবেশী দেশে সন্ত্রাসী হামলা হোক। সে কারণেই দেশে সন্ত্রাসবাদী কোনও ঘাঁটি আছে কিনা, কিংবা অন্য কোনও তত্পরতা চলছে কিনা; আমরা সব সময় তা খেয়াল করি। তেমন কিছুর খোঁজ পেলে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিই। এটা আমাদের খুব স্পষ্ট অবস্থান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তি আর উন্নয়ন আমাদের সরকারের অগ্রাধিকার। শান্তি ছাড়া উন্নয়ন হবে না। আমি তাই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করি। অর্থনৈতিক উন্নয়নই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সাক্ষাত্কারে সাংবাদিক সৃঞ্জয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে যে সংকটগুলো তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, তার অনেকগুলোই পাকিস্তানের সৃষ্টি করা। সে সময় ২০১৬ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনও জঙ্গি হামলা না হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনও দেশ নেই, কোনও সীমানা নেই। নিজের পরিবারকে সন্ত্রাসী হামলার শিকার উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। 

২০১৬ সালে পাকিস্তানের সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়ার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সিদ্ধান্তটি একান্তই নিজেদের। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক সব সময়ই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত আঞ্চলিক সহযোগিতা। তবে প্রত্যেক দেশেরই তাদের নিজ নিজ ভূমিকার পেছনে নিজস্ব কারণ থাকে। আমি স্বীকার করছি, আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালেও সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, মানুষ মারার চেষ্টা হয়েছে। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও সন্ত্রাসবাদী তত্পরতা দেখা গেছে। তবে আমরা যেটা করেছি, তা হলো আমরা একে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি, কমিয়ে আনতে পেরেছি। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক একান্তই তাদের দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। তবে আমি মনে করি, মানুষের কথা ভাবতে হবে আমাদের। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা তখনই সফল হবে যখন অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে অপর দেশ হস্তক্ষেপ করবে না। তিনি বলেন, আমাদের এমন একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে যে কোনও দেশ অন্য কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। সেটা নিশ্চিত হলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। হস্তক্ষেপ ঘটলে বন্ধুত্ব সম্ভব না।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাত্কারে বলেন, আমি আশা করি, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারও তিস্তা সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেবে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তার দলের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসতে না পারলে ‘উঠতে থাকা’ বাংলাদেশ ‘পড়ে’ যেতে পারে। আবার নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ইস্যুতে তিনি বলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার তাগিদ বোধ করেছে বাংলাদেশ। তাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমরা রোহিঙ্গাদের বলেছি আস্তে আস্তে করে নিজ দেশে ফিরে যেতে কিন্তু তারা যেতে রাজি নয়। আমি মিয়ানমারকে বলেছি, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে ভয় পাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে। কারণ তারা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে থাকতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে তারা জঙ্গিদের দ্বারা অপব্যবহার হতে পারে। এ ব্যাপারে ভারতের মধ্যস্থতা প্রত্যাশা করেছেন শেখ হাসিনা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে ঝগড়া লাগাতে চাইনি। আমরা বরং আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছি। বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় আমরা তাদের (মিয়ানমার) বোঝানোর চেষ্টা করেছি, এরা আপনাদের নাগরিক। আপনারা এদের ফেরত নিন।

তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির একটি ভুলের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার সারাজীবনের অর্জনকে কেড়ে নিতে চায়। এটা ঠিক নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বত্রই অং সান সু চির সমালোচনা করা হচ্ছে। নিন্দা জানানো হচ্ছে। এতে আমি বেদনাবোধ করি। তবে হ্যাঁ, ভালো কিছু করতে পারতেন তিনি। আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, তিনি কয়েক দশক একা একা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাদের গণতন্ত্র বিকশিত হচ্ছে। তাই সম্ভবত তার একার জন্য এটা (ভালো কিছু) করতে পারা কঠিন।