শান্তিময় সমাজ গঠনে যা প্রয়োজন

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:২৮

মুহাম্মাদ নাজমুল হক

 

অনেক রস বৈচিত্র্যে, অজস্র গঞ্জ-গাথায় পরিপূর্ণ আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ। গ্রাম-গঞ্জের মানুষের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যনাট্য, শিল্প, ধর্ম, বিশ্বাস, উত্সব-পার্বণ, অভ্যাস, সংস্কার-কুসংস্কার ইত্যাদি নানা লৌকিক প্রতিবেশের ঋদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের রূপকথাই বাংলাদেশের পরিচয়। এখানে রয়েছে ভাটিয়ালির ভাটির স্রোতের গান, শাশ্বত বাংলার ফসল তোলার গান। আছে নানা রকমের লোকজ উত্সবসহ লোকজীবনের বহু বিচিত্র অভিব্যক্তি। এই আবহমান গ্রাম-বাংলার সংসৃ্কতিকে নিবিড়ভাবে জানা প্রয়োজন। আর তা জানতে হলে আমাদের শেকড় সংস্কৃতি, গ্রামীণ মানুষ, তার ভাষা-সাহিত্য, লৌকিক শিল্প প্রকৃতি, গ্রামীণ সমাজ, সবকিছুকে অন্তর্দৃষ্টি মেলে নিরীক্ষণ করা চাই। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার সংস্কৃতির সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘cultuer is what we are or have i.’  আমরা অথবা আমাদের যা কিছু আছে তাই আমাদের সংস্কৃতি। অর্থাত্ কোনো স্থানের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যকলা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় তাই-ই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির মূলকথা নিজেকে সুন্দর করা, সভ্য করা। প্রেম ও সৌন্দর্য সংস্কৃতির মূল আশ্রয়। এ আশ্রয় থেকে বিচ্যুত হলে সংস্কৃতি ধ্বংস হয়, হারিয়ে যায়। একটি দেশের সংস্কৃতি সেই জাতির পরিচয় বহন করে।

জাতিগতভাবে আমাদের বাংলাদেশের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। সেটাই আমাদের পরিচয়। এখন বিশ্বায়নের সময়ে খুব সহজেই সংস্কৃতির বিনিময় হচ্ছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, স্যাটেলাইট চ্যানেল ইত্যাদি অনুষঙ্গের দ্বারা আমাদের মুহূর্তেই জানিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের খোঁজখবর, চিন্তাধারা। সেখানকার জীবনাচরণ। কখনো আমরা নিয়ে নিচ্ছি সেই সংস্কৃতির অনেকটাই। আর এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক এবং বৈশ্বিক ব্যাপারই কখনো কখনো আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। যেটাকে আমরা বলছি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এই আগ্রাসনের কারণে যখন কোনো সংস্কৃতি অন্য কোনো সংস্কৃতির ওপর প্রভাবক হিসাবে চেপে বসে এবং সেই সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নিতে চায় তখন সেটা হয়ে ওঠে কোনো জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ সংস্কৃতির মূল ধারায় নিয়ে আসা জরুরি।

একটি দেশের অন্যতম মৌলিক শক্তি হলো সে দেশের নবীন প্রজন্ম। একটি শান্তিময় ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকে মাদক, ইন্টারনেট বা প্রযুক্তি আসক্তি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ভয়াবহ কালো ছোবল তথা অন্ধকার জীবনের হাতছানি থেকে বাঁচাতে হবে। দেশের সর্বত্র শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রসার ঘটাতে হবে। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে হবে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে। সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে তরুণদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে। সংগীত ও শিল্পকে অনুভব করার শক্তি, সংস্কৃতিকে হূদয়ে ধারণ করার শক্তিই হচ্ছে আলোকিত সমাজ গড়ার মূলমন্ত্র। একটা মুক্তমনা, মানবিক ও সহনশীল সমাজ গড়তে হলে সুস্থ সংস্কৃতি হূদয়ে লালন করতে হবে। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমেই সমাজের সকল প্রকার অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হলে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টির বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একজন সংস্কৃতিবান মানুষ কখনো জঙ্গিতত্পরতা কিংবা মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিতে পারে না। বরং সে একজন মানবদরদি জ্যোতির্ময় মানুষ হিসেবে সমাজে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। সমাজ উন্নয়নের অংশীদার হবে। আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এক অস্থির সময় অতিবাহিত করছে। কিশোরদের মধ্যে অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতে তরুণ প্রজন্মকে সংস্কৃতির সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে এনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। তাহলেই গড়ে উঠবে অসাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাস-দুর্নীতিমুক্ত শান্তিময় এক মানবিক সমাজ।

সিরাজগঞ্জ