দীর্ঘ সাধনার বড়ো প্রাপ্তি

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:২৩

৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল। রাওয়ালপিন্ডিতে দিনের খেলা শেষ করল বাংলাদেশ টেস্ট দল। স্টেডিয়ামে বসেই টিভিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় চোখ রাখছিলেন ম্যানেজার সাব্বির খান। কিন্তু এখানে খেলাটা শেষ করতে পারলেন না। হোটেলে যেতে হবে। বাসে সারাটা পথ খুব অস্থিরতায় কাটল। ওয়েবসাইটে চোখ বোলালেন।

হোটেল রুমে ঢুকেই আবার টিভির সামনে। দল বেঁধে বসে খেলা দেখছিলেন। ছোট্ট ছেলে রাকিবুল হাসানের ব্যাট থেকে জয়সূচক রানটা আসতেই উল্লাসে ফেটে পড়ল সবাই। খানিকটা সময়ের জন্য টেস্টের দুঃখ ভুলে যুব দলের বিশ্বজয়ের আনন্দে ভেসে গেলেন সবাই। এই আনন্দের মধ্যে সাব্বির খানের আনন্দটা একটু বেশি।

২২ বছর আগে এই দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম যুব বিশ্বকাপ খেলেছিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। ১৯৯৮ সালে খেলা সেই টুর্নামেন্ট ছিল মেজর কোনো খেলাধুলায় বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ। আর আইসিসির খাতাপত্রে সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অধিনায়কের নাম সাব্বির খান।

সেবার প্লেট চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরা দলের নেতা সাব্বির বলছিলেন, ‘এবারের জয়টা আসলে আমাদের ২২ বছরের চেষ্টার একটা জয়। এই জয় অনেক সাধনার জয়। এটা আমাদের ক্রিকেটের জন্য একটা নতুন মাইলফলক। যে কোনো দেশের যে কোনো খেলায় পরের ধাপে পৌঁছাতে হলে একটা ট্রফির দরকার হয়। সেই ট্রফিটা আমরা পেলাম। নতুন একটা শুরু হলো।’

হ্যাঁ, নতুন একটা শুরু করল বাংলাদেশের ক্রিকেট। এই নতুন শুরুর পেছনের গল্পটা অবশ্য এত সরল নয়। ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো যুব বিশ্বকাপ শুরু করে আইসিসি। সেবারই আমাদের একধরনের অংশগ্রহণ ছিল। সেই টুর্নামেন্টে সহযোগী দেশগুলোর খেলোয়াড়দের নিয়ে ‘আইসিসি একাদশ’ নামে একটা দল করা হয়েছিল। সেখানে সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও হারুনুর রশীদ লিটন।

এর ১০ বছর পর আইসিসি নিয়মিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজন শুরু করে। প্রথম আসরে বাছাইপর্ব পার হয়ে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ। দলটার আসল অধিনায়ক সাব্বির ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দলে যোগ দিয়েছিলেন কয়েক জন সিনিয়র খেলোয়াড়। তাই বাংলাদেশ ম্যানেজমেন্ট আল শাহরিয়ার রোকনকে অধিনায়কত্ব দিয়েছিল, কিন্তু এখনো আইসিসির কাগজপত্রে সাব্বিরই অধিনায়ক আছেন।

সাব্বিরের এই দল পড়েছিল খুব কঠিন এক গ্রুপে। ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড ছিল এই গ্রুপে। মজার ব্যাপার হলো, এই ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড সেবার ফাইনাল খেলেছিল; চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইংল্যান্ড। এর মধ্যে গ্রুপে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল। তাদের সমান ৪ পয়েন্ট নিয়েও রানরেটের কারণে সুপার লিগ খেলতে পারেনি বাংলাদেশ।

সুপার লিগ খেলতে না পারা দলগুলোকে নিয়ে আয়োজিত হয় প্লেট টুর্নামেন্ট। সেখানে ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে ক্রিস গেইল, সারওয়ানরা ছিলেন; গেইল ফাইনালে ১৪১ রান করেছিলেন।

২০০০ সালে আবারও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলতে যায় বাংলাদেশ। হান্নান সরকারের নেতৃত্বে এই দলও প্লেট ফাইনাল খেলে, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হেরে যায়। বৃষ্টিতে গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা ভেসে যাওয়ায় সুপার লিগ খেলার সুযোগ পায়নি দল।

২০০২ সালে নাফীস ইকবালের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল অংশ নেয় যুব বিশ্বকাপে। আফতাব আহমেদ, মোহাম্মদ আশরাফুলের মতো খেলোয়াড় ছিলেন এবারের দলে। কিন্তু পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। প্রথম রাউন্ডে একটি মাত্র জয় ছিল। পরে প্লেট সেমিফাইনালে নেপালের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ দল।

২০০৪ সালে যুব বিশ্বকাপে অধিনায়ক ছিলেন আশিকুর রহমান। এই ভদ্রলোক এখন ক্রিকেট থেকে অনেক দূরে চলে গেছেন। তাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। তার দলও সুপার লিগে যেতে পারেনি। তবে প্লেট চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে। এই অস্ট্রেলিয়া দল পরে অনেক তারকার জন্ম দিয়েছে।

২০০৬ সালে মুশফিকুর রহিমের দলকে নিয়ে ছিল বিরাট স্বপ্ন। এই দলটাকে ইতিহাসের সেরা যুব দল বলা হচ্ছিল। এরা ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিতে ফিরেছিল। কিন্তু মূল টুর্নামেন্টে এসে হতাশ করে তারা। গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ড-পাকিস্তানকে উড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়েছিল; প্রথমবারের মতো সুপার লিগ খেলেছিল বাংলাদেশ দল। কিন্তু সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে। শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে পঞ্চম হয়েছিল দলটা।

২০০৮ সালে বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন সোহরাওয়ার্দী শুভ। তার দলও কোয়ার্টার ফাইনালে হারে। ২০১০ সালে আবার ভরাডুবি হয় মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বাধীন দলের। এবার আবার সুপার লিগে যেতে ব্যর্থ হয় দল। অবশ্য আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে প্লেট চ্যাম্পিয়ন হয় দল। ২০১২ সালে এনামুল হক বিজয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল আবার সুপার লিগে যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হারে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০১৪ সালে মেহেদী হাসান মিরাজ নেতৃত্ব দেন দলকে। অনেক দিন পর আবার সুপার লিগে যেতে ব্যর্থ হয় যুব দল। নবম স্থান অধিকার করে তারা নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে।

২০১৬ সালটা ছিল অন্যরকম। এবার দেশের মাটিতে যুব বিশ্বকাপ। মেহেদী হাসান মিরাজ দ্বিতীয়বারের মতো নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ দলকে। এবার বাংলাদেশ দল নিয়ে খুব হইচই ছিল। তরতর করে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালেও উঠে যায় মিরাজ-শান্তদের দল। কিন্তু সেমিফাইনালে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে যায় তারা। প্রাপ্তি বলতে মিরাজ ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে সাইফ হাসানের অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ দল খেলে। এবার সুপার লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে হারে তারা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

এরপর সামনে এলো ২০২০। এই আসর নিয়ে দুই বছর আগে থেকে শুরু হয় পরিকল্পনা। এবারের প্রস্তুতি নিয়ে বলতে গিয়ে সাব্বির খান মজার একটা কথা বলছিলেন, ‘আমরা যখন যুব বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলাম, সেটা ছিল আমাদের দ্বিতীয় ভিসা পাওয়া। আর এবার যারা গেছে, ওদের প্রথম পাসপোর্ট শেষ হয়ে দ্বিতীয় পাসপোর্টে ভিসা দিতে হয়েছে। বুঝতেই পারছেন, ওরা কত বেশি প্রস্তুতি নিয়েছে।’

জানা গেছে, এবার বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতির জন্য বিশেষ পরিকল্পনা ছিল বোর্ডের। ডেভেলপমেন্ট কমিটি পুরোনো ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখে যে বাংলাদেশ আগের বেশির ভাগ আসরে মূলত খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একটা ম্যাচ হেরে বিপদে পড়েছে। ওরকম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না তাদের। ফলে এদের অনেক ম্যাচ খেলানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বাংলাদেশ যুব দল দেড় বছরে ৩০টা ম্যাচ খেলে, যার অধিকাংশই দেশের বাইরে।

এর পাশাপাশি এই দলটার মানসিক শক্তি বাড়ানোর জন্য বিশেষ সব সেশনের আয়োজন করা হয়। এমনকি তাদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর জন্যও কাজ করা হয়। এই দেড় বছর তারা একই কোচিং দলের অধীনে কাজ করতে থাকেন। ফলে একটা পরিবার হয়ে ওঠেন। বলা চলে, গত দেড় বছর ডেভেলপমেন্ট কমিটি এদের জীবনযাপন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করেছে। আর তারই ফল এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকায়।

শুরুতে ভাবা হয়েছিল, মাহদুমুল হাসান জয় এই দলের নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু আকবর আলীর নেতৃত্বগুণ ও শান্ত থাকার ক্ষমতা দেখে তাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়। আর এই সবকিছুই ফল দেয় সেদিন পচেফস্ট্রুমে। আকবর আলীই বীরত্ব দেখিয়ে বের করে আনেন অবিশ্বাস্য এক ফাইনাল। অনেক সাধনার এক বিশ্বকাপ জয় হলো বাংলাদেশের।