উহানে বিপত্তি

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৪২

/ অয়েজুল হক

 

শীত যাবে যাবে ভাব। যাওয়ার আগে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি দিয়ে নিজেকে জানান দিচ্ছে। দিনের বেলা বিশেষ করে দুপুরের দিকে বেশ গরম, তারপর আবার শেষ রাত থেকে কঠিন ঠাণ্ডা। ফালু মিয়ার ছেলে ফিরোজ রাতভর খকখক করে কাশে। ইদানীং তার সাথে যোগ হয়েছে—বউ আর পিচ্চি দুই নাতি। একজন থামলে আরেকজন শুরু করে। শুয়ে শুয়ে ভাবেন, এত বয়স হয়ে গেলেও তিনি এখনো এদের চেয়ে সুস্থ। রোগব্যাধি যে হয় না তা নয়। অসুখ হয় আবার আপনা আপনি সেরে যায়। তাগড়া ছেলে। কড়ি কড়ি টাকার ওষুধ খায় কিন্তু সহজে সুস্থ হবার নাম নেই। অর্ধেক ঘুম, অর্ধেক সজাগ। রাত পেরিয়ে সকাল হতেই প্রতিদিনের মতো গ্রামের চায়ের দোকানে গিয়ে বসে। ফালু মিয়া কৃষক হলেও এই চায়ের দোকানে বসে অনেক কিছু শিখেছে। চা দোকানি কেটলিতে পানি চড়িয়ে টিভি চালিয়ে দেয়। ফালু মিয়ার বন্ধু পল্টু সম্ভবত টিভির অপেক্ষায় ছিল। টিভি চালাতেই খুশিতে বিড়ি ধরায়। কষে টান মেরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, ‘আজকাল টিভিতে খালি ম্যারাডোনা ভাইরাসের খবর কয়’।

এককোনায় বসে থাকা মেম্বার সাহেব উঠে আসেন। তিনি ম্যারাডোনার খুব ভক্ত। পল্টুর দিকে লাল চোখে তাকিয়ে বলেন, ‘বয়স হলো ছাগলামি গেলো না। এই ব্যাটা কিসের আবার ম্যারাডোনা ভাইরাস’?

পল্টু কিছুক্ষণ মাথা চুলকিয়ে বলে, ‘সরি, ম্যারোনা ভাইরাস’।

মেম্বার সাহেব গম্ভীর গলায় বলেন, ‘মুর্খের মতো কথা বলবি না। এইটা হলো কারিনা ভাইরাস। ওই যে নায়িকা আছে না’?

পল্টু ঘাড় নাড়ে, ‘হু’।

—এই নায়িকার প্রথম রোগটা হইছে। মারাত্মক রোগ। নায়িকা তো ভাইরাসে খুব অসুস্থ। এ কারণে কারিনা ভাইরাস।

—অনেক মানুষ বলে, আক্রান্ত হইছে।

—হ্যাঁ। ভাইরাস কী বসে থাকবে। দেখলে না ডেঙ্গু ভাইরাস কেমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ মারল। ডেঙ্গু হলো জ্বর, আর এইটা হলো হাঁচি-কাশি রোগ। হাঁচি দিতে দিতে মানুষ মরে যায়।

মেম্বার সাহেবের কথায় ফালু মিয়া চিন্তায় পড়ে যান। তার ছেলেটা জন্ম থেকেই হাবাগোবা। কাশির জন্য ভালো ডাক্তার দেখানো দরকার। সেদিন বিকালেই ছেলেকে নিয়ে শহরে ছুটেন। দুই ঘণ্টা বাসে চেপে শহরে এসে বাস থেকে নামতেই ফিরোজ উধাও। সামান্য হেঁটে একটু নিরিবিলি জায়গা দেখে দাঁড়ান। দূরে কয়েকজন তরুণ আড্ডা দিচ্ছে। তাদের কথায় রাগ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ফালু মিয়া চুপ করে শুনতে থাকেন।

—তরুণরা বিশ্বজয় করে, আর বুড়োরা হেগে দেয়।

—এদের টেস্টের দরকার কী?

—বাংলাদেশের টেস্টের দরকার নেই।

ফালু মিয়ার রাগ চড়লেও নিজেকে সামলে নেন। ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে এসেছেন। ডাক্তার সবার আগে দেবে টেস্ট। তার জানা দরকার বাংলাদেশের টেস্ট দরকার নেই কেন! ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘তুমাগে বয়স কম, কিন্তু মুরুব্বি গে সম্মান তো করতি হবে। বুড়োরা হেগে দেয় এসব বলতি হয় না। জোয়ান-বুড়ো সবাই তো ওই কাম করে’।

আড্ডার ভেতর কোনো আগন্তুকের ঠেলে দেওয়া কথা তারা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। একজন লাল চোখে বলে, ‘পাগল না কবি’?

—আমি চাষবাস করি। ছোটকালে কবি হবার সখ ছিল।

—হ্যাঁ, এখন তো মানুষের চেয়ে কবি বেশি। আপনিও কবি।

এর ভেতর ফিরোজ খ্যাকখ্যাক করে কাশি দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।

ফিরোজকে দেখে ফালু মিয়া প্রশ্ন করেন, ‘কুহানে গেছিলি’?

—ওই তো উহানে।

হঠাত্ করে তিনটে ছেলে লাফ মেরে সরে দাঁড়ায়।

—উহানে গিয়েছিল? উহান! ওরে বাবা... করোনা ভাইরাস।

বলেই ভো-দৌড়। দূরে গেলেও তাদের চিত্কার ভেসে আসে। শুধু বলছে, করোনা ভাইরাস...। মহূর্তে জমজমাট শহর ফাঁকা হয়ে যায়। একটু পরেই আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা চার-পাঁচজন রোবটের মতো মানুষ এসে প্রশ্ন করে, ‘কোথায় এসেছেন’?

—ছেলেটার সদির্, কাশি। সহজে সারতিছে না। ডাক্তার দেখাতি আইছি।

এবার ফিরোজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘আপনি উহানে গিয়েছিলেন’?

—হ। গেছিলাম।

কথা শেষ হতেই রোবট মানুষগুলো কেঁপে ওঠে। দৌড়ে পালাতে পারলে তারাও যেন বড় বাঁচা বেঁচে যেতেন। কিন্তু বিশেষ কোনো কারণে পালিয়ে যেতে পারছেন না।

ফালু মিয়া অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘আফনাগে পরিচয় জানতি পারলাম না’!

—আমরা ডাক্তার। আপনাদের হাসপাতালে যেতে হবে।

—চলেন, ছেলেডারে একটা ভালো ডাক্তার দেখাতি আইছি।

চলা শুরু হয়। রোবট মানুষগুলো মোটামুটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে। হাসপাতালে পৌঁছাতেই হুড়োহুড়ি শুরু হয়। ফালু মিয়া ও ফিরোজকে দেখে অনেক দূরের মানুষও দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। যদিও বর্তমানে ফাঁকা হাসপাতাল দেখা মুশকিল। রোগীর ঘাড়ে রোগী।

ফালু মিয়া ঘটনার আগা-মাথা কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। একটু পরেই ফিরোজকে আলাদা করে নিয়ে যাওয়া হয়। ফালু মিয়াকে বন্দী করা হয় একটি ঘরে। দরজা জানালা বন্ধ। মাঝে মাঝে ডাক্তার নার্স আসছে। কে পুরুষ, আর কে মহিলা বোঝার উপায় নেই।

ফালু মিয়া বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আমি বাড়ি যাব’।

—দুঃখিত। আপনাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

—মানে!

—এখানে কমপক্ষে ১৪ দিন আটকা থাকতে হবে। কোয়ারেন্টাইন।

—আমার অপরাধ কী?

—আপনি তো জেলখানায় না।

—জেলখানা এরচেয়ে ভালো। একটু ঘোরাফিরা করা যায়। এখানে তো দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমার ছেলে কই?

—আইসুলেশন বিভাগের করোনা ইউনিটে।

—আমাকে নিয়ে চলুন। আমি আমার ছেলের সাথে থাকব।

—সরি, আপনাকে এখানে থাকতে হবে। এভাবেই।

ফালু মিয়া বুঝে উঠতে পারেন না তিনি কী জগতে আছেন, না জগত ফুঁড়ে বেরিয়ে অন্য কোনো জগতে এসে হাজির হয়েছেন।

একদিন পর একের পর এক ফোন আসা শুরু হয়। প্রথমে ফোন করে ফালু মিয়ার বউ।

—হ্যালো।

—হু।

—তুমি কই?

—কারেন্ট ট্রেনের ভেতর আছি।

—সেটা আবার কী ট্রেন?

—আমি কিছুই বুঝতে পারতিছি না। ওরা বলিছে, কারেন্ট ট্রেনে ১৪ দিন থাকতে হবে।

—ওরা কারা?

—জানি না। চান্দের দেশে যারা গেছিল...।

—হ্যাঁ।

—সেই রকম। চেহারা দেখা যায় না।

ফালু মিয়ার বউ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। তারপর গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মেম্বার সাহেব পর্যন্ত ফোন করেছেন। সবার এক প্রশ্ন, কোথায় আছেন?

ফালু মিয়া জবাব দেন, ‘কারেন্ট ট্রেনে আছি। আর কিছু জানি না।’

পাঁচদিন পর গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান সহ ফালু মিয়ার স্ত্রী, অত্মীয়-স্বজন হাসপাতালে এসে হাজির।

চেয়ারম্যান সাহেব বিভাগীয় প্রধান ডাক্তারের কক্ষে ঢুকে ফিরোজ নামের রোগীর সন্ধান পেয়ে যান। ফালু মিয়াকে আটকে রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করতে ডাক্তার সাহেব বলেন, আপনি গুণীজন। দেশ ও মানুষের কথা ভাবুন। ফিরোজ মিয়াউ হানে ছিল। যদিও সে এখন সুস্থ, তারপরও তাকে ফলোআপে থাকতে হবে। ফালু মিয়াকেও...

চেয়ারম্যান সাহেব অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘ফিরোজ কোন উহানে ছিল’?

—চীনের উহান প্রদেশ। যেখানে করোনা ভাইরাসের উত্পত্তি।

চেয়ারম্যান সাহেব হাসতে হাসতে বলেন, ফিরোজের উহান সে উহান নয়। ওখানে ছিল বুঝাতে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘উহানে’। উহানে ঝামেলা লেগে গেছে। সে এখন কোহানে? চলুন যাই।