হালের বইমেলা

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৪৪

বউ ফোন দিয়ে বলল, তুমি কই?                      বললাম, নীলক্ষেত।                        কাছেই তো গাউছিয়া মার্কেট। আমার জন্য একটা নীল ড্রেস আনবে। আগামী সপ্তাহে পাশের বাড়ির বিয়েতে পরব।

রাতে বাড়ি ফিরলাম। বউ দৌড়ে এসে হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিল। ব্যাগ খুলে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল, ব্যাগ ভর্তি এগুলো কী?

আমি কাচুমাচু গলায় বললাম, বই। অতি সস্তায় পেয়েছি। অনেক নামকরা লেখকের বই।

আমার নীল ড্রেস কই?

আনিনি। বাজেট ফেইল।

বউ রাগ করে ব্যাগ ফেলে চলে গেলো।

বই কেনা আমার শখ। আমি প্রচুর বই কিনি, তবে সব বই পড়া হয় না। আমি বেশির ভাগ বই কিনি নীলক্ষেত থেকে। নীলক্ষেত গিয়েছি অথচ একটা বই কেনা হয়নি এমনটা হবে না। নীলক্ষেত থেকে অতি সস্তায় নিজের মনের মতো বই কেনা যায়। অনেক দুষ্প্রাপ্য বই আমি নীলক্ষেত থেকে কিনেছি।

বইমেলা চলছে। অনেকেই নতুন বই বের করছেন। নতুন লেখকদের জন্য রইল শুভকামনা। আশা রাখতে চাই, সব নতুন লেখকদের বই ভালো যাবে। তবে কিছু কিছু নতুন লেখকের ব্যবহার আমাকে আহত করে।

হুমায়ূন আহমেদ তখন বেঁচে আছেন। মেলায় গেছি। হুমায়ূন আহমেদের বই কিনব। স্টলে গিয়ে দেখি খুবই ভীড়। হুমায়ূন আহমেদ এসেছেন। অটোগ্রাফের জন্য লোকজন যেন পাগল হয়ে গেছে। কমপক্ষে দশজন লোক ভীড় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন।

আমি একঘণ্টা অপেক্ষা করলাম, ভীড় কমলে বই কিনব ভেবে। কীভাবে সারা মেলায় রটে গেছে হুমায়ূন এসেছেন। আর যায় কোথায়?  সারা মেলার লোকজন যেন ছুটে এলো তাকে দেখার জন্য। ভয়াবহ অবস্থা!  আমার আর বই কেনা হলো না।

একটা সময় ছিল, সারা মেলায় সব লেখকের মোট যত বই বিক্রি হতো, অর্ধেকের বেশি বই শুধু হুমায়ূনের বিক্রি হতো। অকল্পনীয় ব্যাপার!

জাফর ইকবাল যখন বইমেলায় আসেন, তখনো অটোগ্রাফ শিকারির পাল্লায় পারেন। তিনি হাসিমুখে অটোগ্রাফ দিয়ে যান। এক সময় ইমদাদুল হক মিলন ভালো লিখতেন। তাকেও প্রচুর অটোগ্রাফ দিতে দেখেছি। লোকজন হন্যে হয়ে তাদের খুঁজতো অটোগ্রাফের আশায়। আর এখন?

এখন হয়েছে উল্টো। লেখক এখন পাঠকের পিছনে দৌড়াচ্ছে অটোগ্রাফ দেওয়ার আশায়। ব্যাপারটা...।

গতবারের বই মেলার কথা বলি। বই মেলায় গেছি, কিছু  বই কিনব। কিছু ভালো লেখক তৈরি হয়েছে নতুনদের মধ্যে। নতুনদের মধ্যে অনেকেই আছেন মেধাবী, নতুন আইডিয়া নিয়ে এসেছেন। তবে নতুন লেখকদের মধ্যে অনেক লেখকের লেখা অখাদ্য। পকেটে টাকা আছে তাই বই প্রকাশ করে ফেলেছেন। ফেসবুকের প্রোফাইল ঘেঁটে দশটা গল্প কবিতা পাওয়া যাবে না এমন লোকজনও পয়সা খরচ করে বই বের করে ফেলেন। ভুল বানান, ব্যাকরণ না জানা লোকজনের বই কিনে বিলাসিতা করা আমার রুচির পরিপন্থী।

মেলায় একজন পরিচিত নতুন লেখকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কুশল বিনিময় শেষে জানালেন, মেলায় তার একটা নতুন বই এসেছে। আমি ভদ্রতার খাতিরে বললাম, দেখি সুযোগ পেলে আপনার বই কিনব। আর যায় কোথায়?  এ কথা বলেই ফেঁসে গেলাম। তিনি আর আমার পিছু ছাড়লেন না। সারাক্ষণ মেলায় আমার সাথে ঘুরঘুর করলেন। বাধ্য হয়ে তার একটা বই কিনলাম।

তিনি বললেন, ভাই একটা অটোগ্রাফ দেই?

আমি বললাম, ঠিক আছে অটোগ্রাফ দিয়ে দিন।

তিনি অটোগ্রাফ দিয়ে বললেন, ভাই আসেন একটা সেলফি তুলি।

বললাম, ভাই, আমি সাধারণ মানুষ, আমার সাথে সেলফি তুলে আপনার কী হবে?

তিনি বললেন, ভাই আপনি আমার বইটা বুকে ধরে রাখেন।

আমি বাধ্য ছেলের মতো তার বই বুকে জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে পোজ দিলাম। তিনি সেলফি উঠিয়ে আমাকে ধন্যবাদ দিলেন।

আমি মনে মনে বললাম, হায় রে লেখক!

নাম ঠিকানাবিহীন