/ অরুণ কুমার বিশ্বাস
সেই কবে রবি ঠাকুর বিলেত ভ্রমণ করেছেন! আর তারপর শয়ে শয়ে বাঙাল সভ্যতার (!) টানে ব্রিটেন বেড়াতে গেছেন। কিংবা বলা ভালো রানিদর্শন। বলতে নেই, ব্রিটিশরাজের সেই আধিপত্যবাদী ভূত এখনো আমাদের ঘাড়ে বসে দিব্যি নাচছে। কিন্তু ইংরেজদের সেই দাপট কি আর এখন আছে! নেই। তো যা বলছিলাম, আমাদের মনা গেছে বিলেতে। না না, গলাকাটা পাসপোর্ট দিয়ে নয়, সে দস্তুরমতো সবকিছু ঠিকঠাক করেই তবে বিলেতের মাটিতে পা রেখেছে। কাস্টমস-ইমিগ্রেশন পার হয়ে মনা কনকর্স লাউঞ্জ থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। এবার লন্ডন শহরে যাবার জন্য ট্রেন খুঁজছে মনা। ট্যাক্সিতেও যাওয়া যায়, কিন্তু তাতে ঝক্কি বেশি, ভাড়াও প্রচুর। কালো ট্যাক্সি বলে কথা। এই দুনিয়ায় কালো মেয়ের দাম না থাকলেও লন্ডনে ব্ল্যাক ট্যাক্সির চড়া দাম। কেবল সায়েবসুবোরাই ট্যাক্সি চড়ার সুযোগ পায়।
তো হলো কি, মনা আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন বা পাতালরেল ধরবে বলে ছুটোছুটি করছে। তার ইংরেজি জ্ঞান তত টনটনে নয়। সে মালয়েশিয়ানদের মতো টুকটাক ভুলভাল কিছু ইংরেজি জানে। যারা কিনা পুলিশ বানান লেখে ‘পি-ও-এল-আই-এস’। মনা লেখা দেখল—‘মাইন্ড দ্য গ্যাপ বিটুইন দ্য ট্রেন অ্যান্ড দ্য প্লাটফর্ম’। বলতে নেই, জায়গাটা বেশ চওড়া। মনা কিছু না বুঝেই সেই ফাঁকা অংশে দিল পা ঢুকিয়ে। সে ভেবেছে ওটা পার হয়েই তবে ট্রেনে উঠতে হবে। পাশেই দণ্ডায়মান পুলিশ। সুমো কুস্তিগিরের মতোন গাট্টাগোট্টা দেখতে দুজন এসে তাকে চ্যাংদোলা করে বলতে গেলে শূন্যে তুলে ফেলল। পুলিশ ভেবেছে মনা নিশ্চয়ই সুইসাইড করবে। তাই সে স্বেচ্ছায় রেল লাইনের ভিতর পা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আরেকটু হলেই ধাবমান ট্রেন এসে কুচুত করে তার পা দুটো কেটে নিয়ে চলে যেত।
মনা সে যাত্রা বেঁচে গেল ঠিকই, তবে তার আর আত্মীয়ের বাসায় যাওয়া হলো না। পুলিশ তাকে নিয়ে গিয়ে পাগলা গারদে পুরল। তাদের স্থির বিশ্বাস, মনার মগজের নাটবল্টু কিছু একটা ঢিলে হয়েছে, সে দিনেদুপুরে আত্মহনন করতে যাচ্ছিল। তাই বলি কি, ইংরেজি ভালোমতো রপ্ত না করে বিলেতে যাবেন না, প্রাণসংশয় হতে পারে।
০২.
অবশেষে মনা ছাড়া পায়। কারণ তার আচরণে আঁতলামির ভাব নেই। সে মনের আনন্দে লন্ডনের রাস্তা ধরে হাঁটছে। এমন সুন্দর পরিচ্ছন্ন রাস্তা সে আর দেখেনি। এমন রাস্তায় নাকি চোখ বন্ধ করেও হাঁটা যায়, কারণ এখানে হকারের হাঁকডাক বা পুলিশের গুঁতোগুঁতি নেই। মনা হাঁটছে। হঠাত্ সে দেখলো এক ভদ্রমহিলা ডজনখানেক কুকুর নিয়ে উল্টো দিক থেকে আসছে। কুকুরগুলো দেখতে বিড়ালাকার। কেতাবি ভাষায় এদেরকে বলে পুডল। এদের গায়ে লোম বেশি, কিন্তু ঘাঁউ কম। মনার কুকুর পছন্দ। বিলিতি কুকুর হলে তো কথাই নেই। দেশে গিয়ে ‘টল-টক’ করবে সে। বলবে, দিজ ইজ মনা। সে সায়েব কুকুর ছেনে এসেছে।
মহিলা মনার আগ্রহ দেখে বলল, ভায়া, টেক কেয়ার অফ মাই পেটস। আমি একটু দোকানে ঢুকছি। মনা তো মেলা খুশি। মনমতো একটা কাজ পেয়েছে সে। মহিলা সরতেই সে একটা কুকুরকে কোলে তুলে নেয়। অমনি কুকুর পটি করে দেয় মনার হাতে। বেটা কুকুর হয়তো ভেবেছে, যাক কায়দামতো একখানা টয়লেট পেলাম। টুক করে কাজটা বরং সেরেই ফেলি।
মনা চিত্কার দেয়। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে আসে মহিলা। সব দেখেশুনে তার চোখ চড়কগাছ। বিলেতে নিয়ম হলো, তুমি কুকুর পুষতে পারবে, তবে পটি করিয়ে রাস্তা নষ্ট করতে পারবে না। ওটা তোমার বাবার জমিদারি নয়। বাড়ি বানাতে পারবে, তবে গাছ কাটতে পারবে না। মহিলা তো জানে না যে, মনা এসব নিয়মের ব্যাপারে বিশেষভাবে অজ্ঞ মানে, বিশেষজ্ঞ। সে সদ্যোজাত শিশুর মতো টালুক টুলুক করে তাকায়। মহিলা বেকায়দা বুঝে তাকে ঘুষ সাধে। মনার হাতে পঞ্চাশ পাউন্ডের দুটো নোট ধরিয়ে দেয়। সেখানে আবার বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর ছবি ছাপা আছে। মনা কিছু বোঝে না। কুকুর হাগু করেছে, তাতে মহিলা কেন তাকে পাউন্ড দিচ্ছে! মাজেজা কেয়া! মহিলা চলিয়াত। সে জানে, পুলিশ এসে গেলে তাতে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তাই মনাকে সে আরো পঞ্চাশ পাউন্ডের নোট ধরিয়ে দিয়ে কুকুরসমেত কেটে পড়ল। মনা গাড়লের মতো হাসে আর ভাবে, ইস, দেশের মানুষগুলান যদি বিলিতিদের মতো দিলদরিয়া হতো!
০৩.
মনার হাতে মেলা টাকা, থুক্ক, পাউন্ড। সে একটা দোকানে ঢুকে পড়ল। খিদে পেয়েছে খুব, কিছু একটা কিনে খেতে হবে। কিন্তু কী কিনবে সে! মনা তো ইংরেজি পড়তে পারে না। অনেক দেখেশুনে সে একটা প্যাকেট তুলে আনল। দাম চুকাল। কিন্তু মনা জানল না, সাদা চামড়ার এক সায়েব তাকে অনুসরণ করছে। কেসটা কী! মনে মনে সতর্ক হয় মনা। বেটার কোনো কুমতলব নেই তো। সায়েব বলল, হাই ডুড, তুমি খুব গরিব, তাই না! তোমার দেশে দুর্ভিক্ষ লেগেছে!
কেন ভায়া, আমি আবার কী করলাম। বাংলিশে বলল মনা। উত্তরে সায়েব যা বলল তার মর্মার্থ এই, খুব গরিব না হলে তুমি ‘ডগ বিস্কুট’ কেন খাচ্ছো। এটা তো কুকুরে খায়, মানুষের জন্য নয়। মনা বোকা হলেও পুরোপুরি বেবুঝ নয়। তার প্রবলেম—সে ইংরেজিটা ঠিক পড়তে পারে না। এবার প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে মনা দেখল, সেখানে একটা কুকুরের ছবি আঁকা আছে। ওর মতো নন-ইংলিশদের জন্য। দিস ইজ ডগবিস্কুট, নট ফর ম্যান।
০৪.
মনা হিসু চাপতে পারে না। শুনেছে, হিসু চাপলে নাকি কিডনির দফারফা হয়। আবার সে এদেশের নিয়মকানুনও ভালো জানে না। তো হলো কি, জোর হিসু চাপার ফলে সে চোরের মতো আড়াল খুঁজছে। পাশেই পেয়ে যায় পার্ক। লক্ষ্য করে, আশেপাশে কেউ তাকে দেখছে কি না। নাহ, কোথাও কেউ নেই। অমনি প্যান্টের জিপার খুলে জৈবিক নল চালু করে দেয় মনা। তেঠ্যাঙা কুকুরে মতো ছ্যার ছ্যার করে পানি ঢালে। কিন্তু সে বুঝতেই পারেনি, আবডালে বসে পুলিশ তাকে দিব্যি নিরীক্ষণ করছে।
ছুটে আসে পুলিশ। হেই গাইজ, হোয়াট আর ইউ ডুয়িং? পিয়িং হিয়ার!
মনা কল বন্ধ না করেই বলে, না না, আমি গাই না, মানুষ। মাই নেম—মনা।
পুলিশ বুঝতে পারে, সে এখানে নিউকামার। কিন্তু তার জন্য তো আইন আলাদা না। খসখস করে স্লিপ লেখে পুলিশ। ধরিয়ে দেয় মনার হাতে। ষাট পাউন্ড। নগদে দাও, নয়তো জেলে যাও। সঙ্গে পুলিশ ভ্যান আছে, ফ্রি রাইড টু দ্য প্রিজন।
মনার চোখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি। সে ইংরেজি জানে না। ফলে টহলপুলিশ নিজের জিপার খুলে অভিনয় করে দেখায়, পাবলিক প্লেসে ছোটো টয়লেট করার ফাইন ষাট পাউন্ড। দরাদরি করলে অঙ্কটা আরো বাড়বে। আশি পাউন্ড গুনতে হবে। মনা বোকা হতে পারে, কিন্তু বেবুঝ নয়। সে অদ্ভুত এক কাজ করল। সে আবারও জিপার খুলে নল চালু করল। চেপে রাখা বাকি হিসুটুকুও সে পুলিশের সামনেই করে ফেলল। জরিমানা যখন গুনতেই হবে, মিছে ট্যাংকি ভরে রাখবে কেন! মনের সাধ মিটিয়ে মনা লন্ডন পার্কে মূত্রত্যাগ করল। তারপর কুকুরের পটিতে পাওয়া ক্ষতিপূরণ থেকে ফাইন দিল। পাপের ধন প্রায়শ্চিত্তে গেল। দ্বিতীয়বার সে কেন হিসু করল! কারণ মনা জানে, এক মুরগি তো আইনে দুইবার জবাই হয় না। তাও তার আক্ষেপ থেকে যায়। ইস, ছোটোর সাথে বড় কাজটাও সে কেন করল না! না হয় যেত আর দুটো পাউন্ড। দুশ বছর ওরা আমাদের কম জ্বালিয়েছে!
০৫.
সবশেষে কমন জোকস একটা। ফেরার পথে মনা ওর আত্মীয়ের বাসা খুঁজে পায় না। একজনকে ঠিকানা লেখা কাগজ দেখায় সে। সায়েব বলল, গো স্ট্রেইট, দেয়ার ইজ আ পর্ক। আদার সাইড ইজ ইওর হাউজ। মনা জানে, পর্ক মানে শূকর। প্রাইমারিতে পড়েছিল। কিন্তু এখানে তো কোনো শূকর নেই! লোকটা কি তবে মিছে বলল। অনেক চেষ্টা করে সে দুটো লম্বামুখো কুকুর খুঁজে পেল, কিন্তু পর্ক বা শূকর তার চোখে পড়ল না।
কেসটা কী হলো! লোকটা আসলে বলতে চেয়েছে, পর্ক মানে পার্ক বা উদ্যান। শূকর নয়। মনার মুখে পান। সে বাসার খোঁজে দিগ্বিদিক ছুটে, আর পানের পিক ফেলে। তাতে ভীত হয়ে ছুটে আসে আরো দুজন। চেঁচায়—লুক, দ্যাট গাই ইজ স্পিটিং ব্লাড। টেক হিম টু হসপিটাল। রাইট নাউ।
তারা তার পিছু নেয়। ভয় পেয়ে মনাও ছোটে আর সমানে পানের পিক ফেলে। অবশেষে সে ধরা খায়। মনার জায়গা হয় লন্ডনের ক্রমওয়েল হাসপাতালে। মানেটা কী দাঁড়াল—বিলিতিরা বোকা হতে পারে, তবে দায়িত্বহীন নয়। মনা রক্তবমি করছে (আসলে পান) ভেবে ঠিক তাকে হাসপাতালের বেডে এনে শুইয়ে দিল।
