দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
দেশের বর্তমান অবস্থা খুব ভালো। এটা আওয়ামী লীগের কেন, অনেকেরই ধারণা। আমারও ধারণা; কিন্তু এ ধারণাটা যে ভুল হতে পারে তা আমরা কেউ ভেবে দেখছি না। দেশের অর্থনীতি খুবই ভালো—এ কথা বলতে বলতে আমাদের অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি একটা খারাপ দিকের কথা স্বীকার করেছেন। রাজনীতিতে একটা স্থিতাবস্থা আছে। সেটা স্থিতাবস্থা, না ঝড়ের আগের স্তব্ধতা তা কেউ বলতে পারে না।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও সমর্থকের মধ্যে একটা আত্মসন্তোষের ভাব দেখি। আত্মবিশ্বাস ও আত্মসন্তোষ এক কথা নয়। আত্মসন্তোষের জন্য খরগোশ হেরে গিয়েছিল কচ্ছপের কাছে। আর আত্মবিশ্বাসের জন্য কচ্ছপ জিতে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের আত্মসন্তোষের কারণ, দেশে দৃশ্যত এখন কোনো অপজিশন নেই। বিরোধী দল নেই। সংসদের ভেতরে-বাইরে বিএনপি কোমর ভাঙা। জামায়াত আপাতত বিষদাঁতবিহীন। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) হিজড়া পার্টি। ড. কামাল হোসেন ও ঐক্যফ্রন্ট, বাক্যবান ছাড়া তাদের আর কোনো অস্ত্র নেই।
সুতরাং আওয়ামী লীগকে আর পায় কে? একমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া সম্ভবত অধিকাংশ মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, এমপি ও নেতারা ভাবছেন আওয়ামী লীগকে আর পায় কে? আগামী চার বছর কেন, তার পরবর্তী পাঁচ বছরও তারা সুখে রাজত্ব করবেন। এই ধারণার ফলেই হয়তো বাজারে মুজিবকোটের এত চাহিদা এবং চড়া দাম। তোয়াজ এবং স্তাবকতাও গগনচুম্বি হয়ে উঠেছে।
মুজিববর্ষ পালন উপলক্ষ্যে দেশ মুজিবপন্থিতে ভরে গেছে। কে কত বড়ো মুজিব অনুসারী তা দেখানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। এসব দেখে কি মনে হয়, এই বাংলাদেশের মাটি মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর আগে—স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছর না পেরুতেই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তারপর ২১ বছর এই দেশে জাতির জনকের নামোচ্চারণও নিষিদ্ধ ছিল। এক খলনায়ক এসে মহানায়কের সম্মান ও মর্যাদা অপহরণ করেছিল?
হযরত মোহাম্মদ (স.) মুসলমানদের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে সতর্ক করেছিলেন যে, ‘কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি ভালো নয়। ধর্ম নিয়েও নয়।’ এককালে যারা অকৃতজ্ঞের মতো বঙ্গবন্ধুর নামনিশানা মুছে ফেলতে বাড়াবাড়ি শুরু করেছিলেন, সেটা ছিল পাপ। আজ যারা ভোল পালটে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন নিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন, তারাও খুব ভালো কাজ করছেন না। এটাও একদিন ব্যাকল্যাশ হতে পারে। আওয়ামী লীগারদের কাছে শুনতে খারাপ লাগলেও সতর্কবাণীটা আগেই উচ্চারণ করে রাখলাম। কারণ, আমি বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত অনুসারী এবং আওয়ামী লীগের হীতাকাঙ্ক্ষী।
অবশ্যই মুজিববর্ষ পালন করা উচিত। সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন দ্বারা। উত্সবের বাড়াবাড়ি দ্বারা নয়। আমি জীবনসায়াহ্নে পৌঁছেছি। জীবনে অনেক কিছুই দেখেছি। তার অভিজ্ঞার জোরেই বলছি, কোনোকিছুতেই বাড়াবাড়ি ভালো নয়। এই বাড়াবাড়ির পরিণতি আমি আগেও দেখেছি। দেখেছি বেশি দিন আগে নয়। ১৯৭৫ সালেই।
লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছি। বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। সারাদেশ উত্সবে মাতোয়ারা। সব পেশার লোক দলে দলে বাকশালের সদস্য হচ্ছে। এমনকি সাংবাদিকেরাও। কম্যুনিস্ট সমর্থক ইলিয়াস ভাই (খোন্দকার মোহম্মদ ইলিয়াস) ছাত্র ইউনিয়নের কিছু নেতাকর্মী নিয়ে মিছিল বের করেছেন, স্লোগান—‘যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি—হুররে।’ সবচেয়ে বড়ো উত্সব হয়েছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসানের নেতৃত্বে। এক সকালে দেখি, প্রচণ্ড বৃষ্টি। তা উপেক্ষা করে জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসানের নেতৃত্বে এক বিশাল জনতা পুরোনো গণভবনের সামনে ঢোল বাজিয়ে উত্সব করছেন এবং বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছেন।
এটা ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। তখন ঢাকা শহর ঘুরে মনে হয়েছিল, সারাদেশে বঙ্গবন্ধু ও বাকশালের বিরুদ্ধে একটি লোকও নেই। মাত্র পাঁচ মাস পর জুন মাসে আবার লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরেছি। দেখি, সারাশহরে কেমন এক রহস্যময় থমথমে অবস্থা। আড্ডায়, ব্যক্তিগত আলোচনায় গুঞ্জন চলছে—দেশে রক্তপাত হবে। এখনকার মতো তখনো দেশে সংঘবদ্ধ কোনো বিরোধী দল ছিল না। বিএনপির জন্ম হয়নি। জামায়াত, মুসলিমলীগ, নেজামে ইসলাম নিষিদ্ধ। ভাসানী ন্যাপ ছত্রভঙ্গ। মুজাফ্ফর ন্যাপ ও মনিসিং কমিউনিস্ট পার্টি তখন আওয়ামী লীগের অঙ্গীভূত। তাহলে রক্তপাত ঘটাবে কারা? সন্ত্রাসী বামদল অথবা জাসদের এখনো এত শক্তি গজায়নি যে, তারা সরকার উচ্ছেদ করতে পারে।
তবু একমাস পরেই আগস্ট মাসে সেই রক্তপাত ঘটল। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হলেন। দশ বছরের শিশু রাসেলও সেই হত্যাকাণ্ড থেকে বাদ পড়ল না। সবচাইতে বড়ো কথা এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর কেউ বঙ্গবন্ধুর নামোচ্চারণের সাহস পর্যন্ত দেখাননি। আওয়ামী লীগাররা না হয় হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ শিকার হয়ে পালিয়েছিলেন। কিন্তু মুজাফ্ফর ন্যাপ ও মনি সিং কম্যুনিস্ট পার্টি? তারা তখনো বাকশালে সম্পূর্ণ আত্মস্থ হননি। বাকশালের অন্তর্ভুক্ত দল হিসেবে মাত্র নাম ঘোষণা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং, সেদিন তাদেরও ছিল, তারা ট্রেনিং এবং হাতে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের উত্থান রুখে দাঁড়ালেন না কেন? বরং ১৫ আগস্টের ট্রাজেডির পরপরই জিয়াউর রহমানকে সমর্থন জানিয়ে তার খাল কাটার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন কীভাবে?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার অনুসরণে বলতে হয় সেদিন কেউ ফ্যাসিস্টদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসেনি। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধু হত্যার সময় বিদেশে ছিলেন। তিনি এই বর্বরতার প্রতিবাদে একটি কথা বলেননি। বরং লন্ডনে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ সভা থেকে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছিলেন। আশির দশকের গোড়ায় শেখ হাসিনা তার জীবনের ওপর সকল হুমকি অগ্রাহ্য করে দেশে ফিরে দীর্ঘ সংগ্রামের পর গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলে এই বীরপুঙ্গবদের দেখা গেল দেশে ফিরে একেবারে গণতন্ত্রের সৈনিক সাজতে।
জিয়া ও এরশাদের, এমন কি খালেদা জিয়ারও স্বৈরাচারী শাসনামলে ‘এই সরকারকে লাথি মেরে তাড়াও’ বলার সাহস যাদের হয়নি, এখন তারা হাসিনা সরকারকে তাদের বেতো পায়ের লাথির ভয় দেখাচ্ছেন। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ যখন ৭২-এর সংবিধান কেটে তছনছ করেছেন, রাষ্ট্রধর্মের বিধান ঢুকিয়েছেন, তখন এই বীরপুঙ্গবদের কোনো প্রতিবাদ আন্দোলনে নামতে দেখা যায়নি। কিন্তু শেখ হাসিনা কৌশলগত কারণে হেফাজতের সঙ্গে কথা বললে তাকে নিন্দা জানানোর জন্য তাদের কোনো দ্বিধা হয়নি।
এই মুজিববর্ষে মুজিব কোটধারীদের এত বিশাল ভিড় যে মুজিবের আসল ভক্তেরা তাদের ভিড়ে হারিয়ে গেছেন। এই উত্সবের আতিশয্যে মনে হতে পারে দেশে হাসিনা সরকারের কোনো ধরনের বিরোধিতা নেই। কোনো শক্তিশালী বিরোধিতা নেই। আমার অভিজ্ঞতা বলে, সংসদে ও সংসদের বাইরে কোনো বিরোধিতা না থাকা কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য শুভ লক্ষণ নয়, অশুভ লক্ষণ। যে রোগ শরীরের বহির্ভাগে দেখা যায় না, তা শরীরের ভেতরে এমনভাবে বিস্তার লাভ করে যে, তা একজন বলশালী লোকেরও মৃত্যু ঘটায়। যেমন ক্যানসার রোগ।
১৯৭৫ সালে জাসদ ও কিছু সন্ত্রাসী বাম স্প্লিন্টার্স গ্রুপ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী দল ছিল না। জাসদ ও বাম সন্ত্রাসীদের বঙ্গবন্ধু সরকারকে উচ্ছেদের ক্ষমতা ছিল না। তারা ষড়যন্ত্রে মদত জুগিয়েছে মাত্র। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি কমপ্লেক্সের একটি ক্ষমতালোভী অংশ। যার নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। আওয়ামী লীগের মোশতাক গ্রুপ ছিল এই ষড়যন্ত্রের অংশীদার। বঙ্গবন্ধু ডান ও বাম থেকে তার বিরোধী রাজনীতি সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন কিন্তু সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি কমপ্লেক্সের মধ্যেই যে আসল ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে সে সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন না। তাকে ইন্দিরা গান্ধী সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি, তার হাতে গড়া স্বাধীন বাংলার সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষমতালোভী ষড়যন্ত্রকারীদের অনুপ্রবেশ সম্ভব।
গণতান্ত্রিক শাসকেরা যখন মনে করেন দেশে তাদের কোনো বিরোধিতা নেই, দেশের মানুষ তাদের শাসনে সন্তুষ্ট এবং এটা ভেবে তারা আত্মসন্তুষ্টি বা আত্মশ্লাঘায় ভোগেন, বিপদটা তখনই আসে। গোপন শত্রুরা অপেক্ষায় থাকে কখন ক্ষমতাসীন দল ও সরকার আত্মসন্তোষ থেকে অসতর্ক থাকে, প্রকাশ্য বিরোধিতা না থাকায় ভাবে, জনসাধারণের মধ্যে কোনো ধরনের অসন্তোষ বিস্তার লাভ করেনি, তখনই এই গোপন ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় হয় এবং গণতান্ত্রিক সরকারকে আঘাত করে।
এই আঘাত হানার আগের দিন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সরকারের নেতার প্রতি এমন আনুগত্য ও ভক্তি দেখায় যে নেতা তাদের সম্পর্কে কোনো সন্দেহ পোষণ করেন না। ইন্দিরা গান্ধী কি তার বারো বছরের পুরোনো পুত্রতুল্য দেহরক্ষীকে সন্দেহ করতে পেরেছিলেন, সেই তার হত্যাকারী হবে? জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর সামনে চেয়ারে বসতে চাইতেন না, বঙ্গবন্ধুর উচ্ছিষ্ট (ডিমের পুডিং) খেতেন। পাকিস্তানে সেনাপতি জেনারেল জিয়াউল হক ভুট্টোর সামনে নতজানু হয়ে থাকতেন। ভুট্টোকে দেখলে ঠোঁটের সিগারেট ফেলে দিতেন।
বর্তমান হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বড়ো ধরনের জন অসন্তোষ নেই একথা সত্য। বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে জনগণের এক বিরাট অংশ সন্তুষ্ট; কিন্তু জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে আওয়ামী লীগের এক শ্রেণির মন্ত্রী ও এমপিরা, তাদের অত্যাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি, লুটপাটের দ্বারা। দেশে নারী ধর্ষণ শঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। শেখ হাসিনা শুধু মন্ত্রী বদল করেছেন; কিন্তু দুর্নীতিবাজ এমপিদের বদলাননি। এত রদবদল সত্ত্বেও যুব লীগ ও ছাত্রলীগের চরিত্র বদল হয়নি। শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের নয়, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এই ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সিভিল এবং মিলিটারি এসটাবলিসমেন্ট এখন সরকারের পক্ষে। বলতে গেলে তারাই এখন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আছেন। বাঘ যেমন রক্তের গন্ধ পেলে মনিবকেও হত্যা করে, তেমনি এই এসটাবলিসমেন্ট যখন বুঝতে পারে তাদের মাথার ওপর বসা সরকারটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে অথবা হারাতে চলেছে তখনই তারা ভোল পালটায়। ক্ষমতার রক্ত পানে উদিগ্রব হয়ে ওঠে।
এই উত্সবমুখর মুজিববর্ষে একজনমাত্র রাজনৈতিক নেতা সরকারকে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেছেন, দেশের গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ডান এবং তথাকথিত বামেরা মিলে ষড়যন্ত্র করছে। সুবর্ণজয়ন্তীর আগেই তারা আঘাত হানবে। মেননের এই সতর্কবাণী সরকারের উপেক্ষা করা উচিত নয়। মুজিববর্ষের উত্সব চলছে, চলুক; কিন্তু তা যেন জনগণের চোখে আতিশয্য বলে মনে না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত। দরকার, আত্মসন্তোষে না ভুগে আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। মুজিববর্ষ পালনের উত্সবে আমলাদের নয়, জনগণের সম্পৃক্ততা ও নেতৃত্ব প্রয়োজন।
[ লন্ডন, ১৫ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ২০২০]
