অরুণ কুমার বিশ্বাস
হারুন সরখেলের হঠাত্ করেই কিছু অর্থাগম হলো। কীভাবে কামালেন! টাকাকড়ি কি আর সহজে ধরা দিতে চায়। যেভাবেই কামান, কাজটা যে তিনি সিধা পথে করেননি, সেটি সহজেই অনুমেয়। মোদ্দাকথা এই, আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন মিস্টার সরখেল।
বলতে নেই, তার নামের সঙ্গে কাজকামেরও কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি হারুন সরখেল, দুধ বা ঘোল নয়, তিনি শুধু দুধের ওপরে ভাসমান সর খান। সেই সর খেতে খেতে সরখেল আজ বিশাল টাকার মালিক। তিনি দুচারখানা ব্যাংকের শেয়ার কিনে বসে আছেন। তিনি খেলাপি ঋণের স্ট্যাটাস পেয়েছেন। টাকা এখন তার কাছে স্রেফ হাতের ময়লা (প্রচলিত বাগবিধির বিপরীত অর্থে অবশ্য)। টাকা এলে যা হয়, এখন তার বন্ধুবান্ধব, ইয়ার-দোস্ত, সো-কলড শুভানুধ্যায়ী, উমেদারের আর অভাব নেই। তারা সকলে বিলাইয়ের মতো হারুনের পায়ে পায়ে ঘোরে। দুধের মাছি সব। কিন্তু তাতে সরখেলের দুশ্চিন্তা বাড়ে বৈ কমে না। তিনি ভেবেছিলেন টাকা থাকলেই বুঝি সব হয়। কিন্তু দুনম্বরী টাকার সঙ্গে যে উপরি হিসেবে টেনশন আর ব্লাডপ্রেসারের ওঠানামার সম্পর্ক রয়েছে, তা তিনি জানতেন না।
সরখেলের বউও এখন গলা উঁচিয়ে কথা বলে। সে তার ঘরের মানুষ, তাই ভদ্রলোকের আকাম-কুকামের সব ফিরিস্তি তার জানা। ফলে বউ ফোঁস করলেও সরখেলকে ঢোঁড়া সাপের মতো মাথা নিচু করে রাখতে হয়। কারণ মাঝে মাঝে বউ তাকে দুদকের কথা বলে ভয় দেখায়। এও বলে, বেশি ট্যা-ফোঁ করলে সে নাকি টাকাকড়ি নিয়ে তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ভেগে যাবে। এই নিয়ে থানাপুলিশ করলে তার ‘কালা ধান্ধার’ সব খবর সে ফাঁস করে দেবে।
আমি থাকতে বয়ফ্রেন্ড! কেন শুনি? আমার কী নেই যা ওর মধ্যে আছে! রীতিমতো রেগে যান সরখেল। কিন্তু তাতে মুচকি হেসে বউ বলল, উঁহু, কেসটা তো পুরো বাংলা সিনেমা হয়ে গেল। ওর কী আছে শুনবে! ওর কাছে আমার জন্য অঢেল সময় আছে, কিন্তু তোমার তা নেই। তুমি দিবানিশি কেবল টাকার ধান্ধা করে গেলে। একবারও ফিরে দেখলে না, হাসলে আমার গালে কোন্ সাইজের টোল পড়ে—বরই, কতবেল নাকি বেল! তুমি একটা বেরসিক টাকার গোলাম।
সরখেল খেয়াল করে দেখলেন, পোলাপানও তাকে খুব একটা পোছে না। তাদের কেবল টাকার বান্ডিল চাই। বাপের ভালোবাসা না পেয়ে তাদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। রুচিহীন গুঁফো লোকটাকে দেখলে তারা এখন বরং বেশ বিরক্তই হয়। ছেলেপুলে সময়ে আদর দেয়নি, বাঁদর তো তারা হবেই। কিছু লোক আছে দেখবেন, টাকার গন্ধ পেলে ওলপিঁপড়ের মতো একেবারে হেঁদিয়ে মরে। সেই রকম কিছু উমেদার জুটেছে সরখেলের কপালে। তারা অকারণ হারুণ সরখেলের তোষামোদি করে। তার ঢাকের মতো বিশাল পেট, বলে কি না সে দেখতে পুরোই সালমান খান। মাথায় চুলের বড়োই হাহাকার, বলে কি না টাকেই সে দেখতে বেশি কিউট। তাছাড়া কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা থাকলে টাক এমনিই ঢেকে যায়। টাকার আবেশে।
এবার রাশ টানি, কী বলেন! দুনম্বরী টাকাকড়ি যে মোটেও ভালো নয় তার সাক্ষাত্ প্রমাণ হারুন সরখেল। বউ বয়ফ্রেন্ড পেল, আর সরখেল কী পেলেন! লবডঙ্কা। শালার কাছে কিছু টাকা রেখেছিলেন দুর্দিনে কাজে দেবে বলে। সেই শালা বলে কি না চোখ উলটে বলে, কোন্ টাকা, কীসের টাকা? দুটাকার কেরানি এত টাকা পেলেন কোথায়! মামদোবাজি নাকি!
মনের দুঃখে সরখেল ভাবলেন, যাই, মেলা দিন বাদে কইমাছের ঝোল দিয়ে দুটো গরম ভাত খেয়ে আসি। মাছ তিনি পেলেন বটে, তবে দেশি নয়, চাষের কইমাছ। আবার তেলাপিয়াও হতে পারে। কারণ মাছটা দেখতে কেমন নাদুসনুদুস, ঘুষখোর কর্মকর্তার মতো। পেটে কয় পরত চর্বি জমেছে কে জানে! যা হোক, মাছভাত খেতে গিয়ে সরখেলের অক্কা পাবার জোগাড়। মাছের কাঁটা গলায় বিঁধেছে। এজন্যই বলে, পাপ তার বাপকেও ছাড়ে না। নেচার নেভার পে’জ।
স্বজনেরা কপট সহানুভূতির সুরে বলল, চলো যাই সরখেল, হাসপাতাল ঘুরে আসি। কইমাছের কাঁটা নিয়ে হেলাফেলা করতে নেই। গলায় গ্যাংগ্রিন হয়ে যাবে। কিন্তু সরখেলের টাকার গরম তখনো যায়নি। যাকে বলে তামার বিষ। সে বলল, উঁহু, এদেশে কোনো ভালো ডাক্তার নেই। সব কটা কসাই। রোগী পেলেই কুচুত করে অমনি তার গলার নলি কেটে নেয়।
সরখেল সর খেয়ে মিছে সময় নষ্ট করে। তার টাকার গরম সহসা নরম হয় না। সরখেল ভাবে, সে মেলা টাকার মালিক। সে কেন দেশি ডাক্তার দিয়ে চিকিত্সা করাবে! সে ‘বিলাইয়ের পাও’ ধরে। তাতে যদি আপসে কাঁটা ছেড়ে যায়। কিন্তু বিধি বাম, কাঁটা ছাড়ে না, বরং যন্ত্রণা আরো বাড়ে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত আর কি। দিন সাতেক বাদে জমানো কিছু টাকা নিয়ে সিঙ্গাপুরে উড়াল দেয় সে। বড়ো ডাক্তার দেখায় (যদিও তারা সাইজে ছোটো)। দেখেটেখে গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে ডক্টর বললেন, ইটস টু লেট, মিস্টার সগ্গেল। আপনার স্বর্গপ্রাপ্তির সময় হয়েছে। দেরির কারণে গলার ইনফেকশন শরীরে অনেকখানি ছড়িয়ে গেছে। ইউ বেটার গো ব্যাক হোম অ্যান্ড প্রে। বস্তুত, টাকা কারো জীবন বাঁচায় না। সুখও কিনে দেয় না।
কী বুঝলেন! টাকা থাকলেই তা দেখাতে নেই। টাকার গরম বড়োই গম্ভীর। হারুন সরখেল যদি ভূরি ভূরি পাপের কামাই করে পরিবার না খোয়াত, সময়মতো দেশেই ডাক্তার দেখাত, তাহলে হয়তো মাছের কাঁটার খোঁচায় অকালে তার প্রাণ যেত না। কিংবা বলা যায়, এটা একটা উছিলা মাত্র। পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকে করতেই হতো। ধনার্জন মন্দ নয়, তবে মন্দ পথে কামালে তা বিষের চেয়েও বেশি বিষাক্ত।
n লেখক :কথাশিল্পী
