গর্বের ফেরিওয়ালা

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৪০

মোস্তাফিজ মিঠু

 

বিশ্বকাপ মানেই ভিন্ন ধরনের উন্মাদনা। আর সেটি ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ্বকাপ হলে তো কথাই নেই। বাংলাদেশিদের জন্য মৌসুমি উত্সব। জার্সি কেনা, প্রিয় দলের পতাকা টাঙানো, চায়ের দোকানে আড্ডা বা বড় পরিসরে খেলা দেখার আয়োজন। রাস্তাঘাটে টিভি দেখলেই জড়ো হওয়ার চিত্র এমন সময়েই দেখা যায়। তবে এর সবটাই জাতীয় দলের খেলাকে কেন্দ্র করে। এ বছর ১৭ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত হয়ে গেল ‘অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০২০’। ফাইনালে মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ ও ভারত। অথচ উন্মাদনার মাত্রাটা ক্ষীণ। কারণ প্রতিপক্ষ ভারতে কাছ থেকে স্বপ্নের বিশ্বকাপটি জিতে আনতে পারবে কি-না এই ছোট টাইগারার! সেই আশঙ্কা ছিল হয়তো অনেকের। কিন্তু সব ধারণাকেই পাল্টে গেল ফাইনালের দিন ভারত ব্যাটিংয়ের পর।  ম্যাচ তখন হাতের মুঠোয়। উইকেট ধরে ঠিকমতো খেলতে পারলেই ইতিহাসের খাতায় ছোট টাইগারদের নাম উঠতে সময়ের ব্যাপার মাত্র। শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন এসে ধরা দিলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বজয়। পুরো মাঠ জুড়ে লাল-সবুজের পতাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন অনূর্ধ্ব ১৯-এর টাইগাররা। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানকে হারিয়ে ক্রিকেটই দেশের মানুষকে উদযাপনের উপলক্ষ এনে দিয়েছিল। মাঝে নানা সময় আশার গান শুনিয়েছে, হতাশও করেছে। তারপরও সব ভুলে প্রতিটি ম্যাচের আগেই বুকভরা আশা নিয়ে খেলা দেখতে বসেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।

 

সেই আশা এবার শতভাগ পূরণ হয়েছে বাংলাদেশিদের। গায়ে চ্যাম্পিয়নের তকমা লেগে থাকা ভারতকে হারিয়ে নতুন চ্যাম্পিয়ন নিজেদের নামের আগে লেখায় যুব টাইগাররা। ৪ বারের চ্যাম্পিয়নদের মাটিতে নামিয়ে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয় সারাদেশে।

৯ ফেব্রুয়ারি পুরোবিশ্বের কোটি কোটি মানুষের চোখ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে। প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরা একেকটি বল যখন ছুঁড়তে থাকেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৯ ক্রিকেট দলের খেলোযাড়রা। একেকটি উইকেটের যখন পতন হচ্ছিল তখন উল্লাসে ফেটে পড়ছিল সারাদেশের মানুষ। প্রথম ইনিংসে ভারতকে মাত্র ১৭৭ রানে বেঁধে ফেলার পর থেকেই চলে বিশ্বজয় উদযাপনের প্রস্তুতি। রাকিবুলের ব্যাট থেকে বিজয়ের রানটি আসার সঙ্গে সঙ্গে পচেফস্ট্রুমে শুরু হয় জয়ের উন্মাদনা। পচেফস্ট্রুমের গ্যালারি থেকে শুরু করে টিএসসির গ্যালারি ও অলিগলির চায়ের দোকানসহ ঘরের ভেতরে খেলা উপভোগ করা কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর মাঝে বিজয়ের উল্লাস। বিশ্বজয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও জাতীয় পতাকা হাতে বিজয় মিছিল বের করেন তারা। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরের ক্রিকেট কিংবদন্তী ও ধারাভাষ্যকারের মুখেও প্রশংসা বাণী শোনা যায়। যোগ্য দল হিসেবেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। এমন অসংখ প্রশংসা ও শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন ক্রিকেট তারকারা।

 

‘আকবর দ্য গ্রেট’কে বরণ

বিশ্বজয়ের পর থেকে যে নামটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে বেশ আলোচনা তৈরি করেছে সেটি হলো ‘আকবর দ্য গ্রেট’। অনূর্ধ্ব ১৯ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক আকবর আলী। তাকে স্বাগতম জানাতে আয়োজনের কমতি রাখেনি বিসিবি ও ঢাকাবাসী। অন্যদিকে টাইগার যুব অধিনায়ককে বরণ করে নিতে ঘাটতি ছিল না রংপুরবাসীরও। বিমানবন্দরে ফুলেল স্বাগতম, হোম অব ক্রিকেটে লালগালিচা সংবর্ধনা আর সন্ধ্যাভর বিসিবির নানা আয়োজন শেষে ঢাকায় রাত কাটিয়ে বৃহস্পতিবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরলেন।

সৈয়দপুর থেকে দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ক্রিকেট অনুরাগীদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হতে হতে রংপুরে পা রাখেন আকবর। জন্ম শহরে পৌঁছে পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়াসংস্থার আয়োজনে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের দলপতি। ইয়াং টাইগার অধিনায়কের প্রত্যাশা আগামীতে জাতীয় দলের হয়েও বিশ্বজয় করার। বললেন, ‘আপনারা যেভাবে সমর্থন দিচ্ছেন সেভাবেই সমর্থন দেবেন। দোয়া করবেন যেন এভাবেই আরো অনেক সাফল্য আসে।’ এলাকার কৃতিসন্তানের এমন সাফল্যে বাঁধভাঙা আনন্দে ভাসছে রংপুরবাসী, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন। আকবরের হাত ধরে আগামীতে জাতীয় ক্রিকেট দল বিশ্বজয় করবে, এমন প্রত্যাশা সকলের।

 

গ্রামবাসীর সংবর্ধনায় শরীফুল

বৃহস্পতিবার বিকেলে শরীফুল ইসলামকে তার নিজগ্রামে মানুষ ফুলেল শুভেচ্ছা আর মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নেয় সর্বস্তরের মানুষ। তখন তাকে এক নজর দেখতে উপজেলার দণ্ডপাল ইউনিয়নের মৌমারিতে মানুষের ঢল নামে। এর আগে দুপুরে শরীফুল ইসলাম ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে মৌমারির গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বিশ্বকাপে শরীফুলের আগুন ঝরানো একেকটি বল প্রতিপক্ষের ভিতে আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে দাগ কেটেছে দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর মনে। আশা জাগিয়েছে, স্বপ্ন দেখিয়েছে এক সময় জাতীয় দলের হয়েও এমন আগুন ঝরাবেন শরীফুল। কেননা, বিশ্বকাপে তার বোলিংয়ের প্রশংসা শুধু ভক্তরা নন, ধারাভাষ্যকারের মুখে মুখেও ছিলেন শরীফুল।

 

তামিম ও হূদয়কে দেখতে মানুষের ঢল

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের দুই খেলোয়াড় তানজিদ হাসান তামিম ও তৌহিদ হূদয়কে বগুড়ায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। তামিম ও হূদয় বগুড়ার বনানীতে এসে পৌঁছালে তাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর তাদের বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে উপস্থিত ক্রিকেটভক্তরা বগুড়ার এই দুই কৃতিসন্তানকে পেয়ে আনন্দিত হয়ে ওঠেন। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যরা তাদেরসহ উপস্থিত সবাইকে মিষ্টিমুখ করান। তামিম বলেন, ‘আমাদের ক্রিকেট গুরু আমাদের ক্রিকেট শিক্ষক মুসলেম স্যার মারা গেছেন। আমরা খবরটি সাউথ আফ্রিকা থেকে শুনেছি। শুনে খুব খারাপ লেগেছে। আমরা মুসলেম স্যারের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। আমরা দুজনসহ বগুড়ার ক্রিকেটার ও ক্রীড়া সংগঠকদের নিয়ে মুসলেম স্যারের জন্য একটি দোয়ার আয়োজন করবো। আপনারা সবাই সেখানে থাকবেন। দোয়া করবেন যেন এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দেশের মুখ আরো উজ্জ্বল করতে পারি।’ খেলোয়াড়দের মধ্যে তামিমের গ্রামের বাড়ি সোনাতলা উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়নের ফাজিলপুর গ্রামে। আর হূদয়ের গ্রামের বাড়ি গাবতলী উপজেলার দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের নাংলু গ্রামে।