মো. আমিরুজ্জামান
নীলফামারী জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলা। এটি রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার একটি অন্যতম সীমান্তঘেঁষা জেলা। নীলফামারী জেলার উত্তর সীমান্তে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলা এবং অন্যদিকে লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর ও পঞ্চগড় জেলা অবস্থিত।
নীলফামারী জেলাকে নীলের দেশ বলা হয়। এই জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভূ-সংস্থান বেশ সমৃদ্ধ, যা অন্যান্য জেলা থেকে এই জেলাকে কিছুটা হলেও আলাদা করেছে। জেলার উত্তর দিক উঁচু ও খরা পিরিত অঞ্চল, পূর্বদিক তিস্তার বালুকাময়। এই উঁচু ও বালুময় ভূমি ধীরে ধীরে দক্ষিণপশ্চিম দিকে উর্বর কৃষি জমিতে পরিণত হয়েছে। নীলফামারী অতীত ইতিহাসের অনেক সাক্ষী বহন করে। এ জেলায় সত্যপীরের গান, হাঁস খেলা, মাছ খেলাসহ অনেক উত্সব ও মেলার আয়োজন করা হয়।
নীলফামারী একটি কৃষিপ্রধান জেলা। এ জেলার ৬৮.৫% মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দারোয়ানি বস্ত্রকল এ জেলার সর্ববৃহত্ শিল্প প্রতিষ্ঠান। এছাড়া উত্তরা ইপিজেড ও সৈয়দপুর বিসিক শিল্প নগরীর মতো শিল্প পার্ক রয়েছে।
নামকরণ
দুই শতাধিক বছর পূর্বে এ অঞ্চলে নীল চাষের খামার স্থাপন করে ইংরেজ নীলকররা। এ অঞ্চলের উর্বর ভূমি নীল চাষের অনুকূল হওয়ায় দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় নীলফামারীতে নীলকুঠি ও নীল খামার গড়ে ওঠে। ঊনবিংশ শতাব্দির শুরুতেই দুরাকুটি, ডিমলা, কিশোরগঞ্জ, টেঙ্গনমারী প্রভৃতি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়। সে সময় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মধ্যে নীলফামারীতেই বেশি পরিমাণে শস্য উত্পাদিত হতো এখানকার উর্বর মাটির গুণে। সে কারণেই নীলকরদের ব্যাপক আগমন ঘটে এ অঞ্চলে। গড়ে ওঠে অসংখ্য নীল খামার। বর্তমান নীলফামারী শহরের ৩ কিলোমিটার উত্তরে পুরাতন রেল স্টেশনের কাছেই ছিল একটি বড় নীলকুঠি। তাছাড়া বর্তমানে অফিসার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহূত পুরাতন বাড়িটি ছিল একটি নীলকুঠি। ধারণা করা হয়, স্থানীয় কৃষকদের মুখে নীল খামার রূপান্তরিত হয় নীল খামারিতে। আর এই নীলখামারির অপভ্রংশ হিসেবে উদ্ভব হয় নীলফামারী নামের।
কুন্দুপুকুর মাজার
নীলফামারী শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে কুন্দুপুকুর ইউনিয়নে অবস্থিত কুন্দুপুকুর মাজার। এ এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে আসা সুফি হযরত মীর মহিউদ্দিন চিশতির (র.) মাজার এটি। ৩০ একর জমি জুড়ে রয়েছে মাজার ও মাজারসংলগ্ন পুকুর। প্রতি বছরের ৫ মাঘ থেকে ৩ দিন ঔরস অনুষ্ঠিত হয় এখানে।
জনশ্রুতি আছে, ওই পুকুরের পানি পান করলে মানুষ বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পায়। এ জন্য সারাবছর বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে ফিরনি এনে তোবারক হিসেবে দেয়।
তিস্তা ব্যারাজ
প্রতিদিন বিপুল দর্শনার্থীর সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে এই এলাকা। ব্যারাজটি একনজর দেখার জন্য কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও বগুড়া জেলার ভ্রমণপিপাসুরা প্রতিদিন ভিড় করে। বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী তিস্তা। এটি ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর বাংলাদেশে এসে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
তিস্তা নদীর মোট দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে লালমনিরহাট জেলায় অবস্থিত। আর দর্শনীয় ব্যারাজটি তিস্তা সেচ প্রকল্পের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত বৃহত্তম সেচ প্রকল্প। নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর উত্তরাঞ্চলের খরা পিড়িত এলাকা হওয়ায় ১৯৩৭ সালে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। তবে এর মূল পরিকল্পনা করা হয় ১৯৫৩ সালে।
বুড়ি তিস্তা নদীটি আগে তিস্তা নদীর মূলধারা ছিল। কিন্ত কালক্রমে তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হলে এটি শাখা নদীতে পরিণত হয় ও নামধারণ করে বুড়ি তিস্তা নদী। এটি ডিমলা উপজেলা বালাপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি গঙ্গাচড়া উপজেলায় গিয়ে পুনরায় তিস্তা নদীতে মিলিত হয়েছে।
নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ দেশের সব চেয়ে একটি সেচ প্রকল্প। এ প্রকল্প ঘিরে তিস্তার পাড়ে সারাবছর বিভিন্ন এলাকা থেকে থেকে অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে আসেন। ঈদ কিংবা পূজা নয়, উত্সব ছাড়াও বছরের প্রতিদিনই ভিড় জমে এখানে। স্থানীয়রা মনে করেন, ব্যারেজকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র।
