শিল্পের পথের দিশারি

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৪৪

সুমিত্র নাথ

 

শিল্প নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম নয়। কেউ কেউ এই শিল্পকেই জীবনধারণের একমাত্র উত্স হিসেবে নেন। তবে শিল্পকে নিজের মধ্যে ধারণ করা মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। তেমনই একজনের নাম সুস্মিতা বড়ুয়া। এই চিত্রশিল্পী এরইমধ্যে শিল্পের প্রতি নিজের ভালোবাসার প্রমাণ রেখে পেয়েছেন কয়েকটি পুরস্কার।

শুধু পুরস্কারের জন্য নয়, ভালোবাসা থেকেই কাজ করেন এই শিক্ষার্থী। তবে পুরস্কার পেলে কাজে উত্সাহ পান বলেই জানিয়েছেন সুস্মিতা। ‘পুরস্কৃত হওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, তবে পুরস্কৃত হলে কাজ করার উত্সাহ বাড়ে। নিজেকে শিল্পের পথেই নিয়োজিত রাখতে চাই।’—কথাগুলো সুস্মিতার।

সুস্মিতা একজন শিক্ষার্থী। তিনি বৃত্তি পেয়ে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প ইতিহাস বিভাগে স্মাতকোত্তর পড়ছেন। বর্তমানে কাজ করছেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী নৌকা ‘সাম্পান’ নিয়ে।

চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই থানার দমদমা গ্রামে বেড়ে ওঠা তার। ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। তবে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের অমতে ভর্তি হয়ে শেষমেশ ফিরতে হয় সেখান থেকে। চারুকলায় ভর্তি হওয়ার ৪ দিনের মধ্যেই ভর্তি বাতিল করে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হতে হয় তাকে।

তবে শিল্পের প্রতি ভালোবাসা কোনো বাঁধা মানে না, সেটাই প্রমাণ করেছেন এই চিত্রশিল্পী। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ১ বছর পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও আবারো প্রস্তুতি নেন চারুকলায় পড়াশোনা করার। ২০১২ সালে ভর্তি পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অর্জন করে দ্বিতীয়বারের মতো ভর্তি হন সেই পুরনো ঠিকানাতেই। আর এখান থেকেই নতুন করে শুরু তার।

সেখানে প্রথমবর্ষের শেষদিকে দেশের বাইরে (চীন ও ভারত) স্কলারশিপের জন্য আবেদন করা শুরু করেন। তাতেই ভারতের আইসিসিআর-এর ২০১৪-২০১৫ বর্ষে বৃত্তির জন্য মনোনীত হন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শুরু করেন ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প ইতিহাস বিভাগে পড়াশোনা। যেখানে তার ব্যবহারিক বিষয় ছিল ছাপচিত্র। ২০১৮ সালে স্নাতক শেষের পর সুযোগ পেয়ে যান একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার।

স্বপ্ন এবং উদ্দেশ্যের প্রতি সত্ থেকে সততার সঙ্গে কাজ করলে একটু দেরিতে হলেও সাফল্য আসবে বলেই বিশ্বাস করেন এই ছাপচিত্র শিল্পী। তার এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কার গল্প লুকিয়ে আছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার এই শুরুর পথচলায় আশীর্বাদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের প্রাক্তন পরিচালক, ছাপচিত্র বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন স্যার। পরবর্তীতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যকলা অনুষদের সকল শিক্ষক, বিশেষ করে বিভাগীয় শিক্ষকদের পেয়েছি পথচলার আশীর্বাদ হিসেবে।’

আঁকার অনুপ্রেরণা ও হাতেখড়ি বাবা আর ভাইয়ের কাছ থেকে। তরুণ বয়সেই তার বাবা পোট্রেট করতেন। আর দাদা টুকটাক ছবি আঁকতেন। সেখান থেকেই শেখা।

চে গুয়েভারার ‘বিজয় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করো’ এবং আবদুল্লাহ আবু সাঈদের ‘মানুষ নিজেই জানে না, সে তার স্বপ্নের চাইতেও বড়’ এই দুটি লাইনকেই পথচলার পাথেয় হিসেবে নিয়েছেন সুস্মিতা।

এ পর্যন্ত তার ছাপচিত্রের সংখ্যা প্রায় ২০০। যেখান থেকে পেয়েছেন কয়েকটি পুরস্কারও। এবার West Bengal State Academy of Dance, Drama, Music and Visual Arts-২০২০ এর বার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীতে ছাপচিত্র শাখায় তার শিল্পকর্ম "Untitled-8" নামের কাজটি ‘সার্টিফিকেট অফ মেরিট’ পুরস্কার লাভ করে। চলতি বছর একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে এই পুরস্কারটি পান তিনি। এর আগে কয়েকজন বাংলাদেশি এই প্রদর্শনীর শুরু থেকে বিভিন্ন শাখায় পুরস্কার লাভ করেন। তার এই পুরস্কারটি উত্সর্গ করেন সদ্যপ্রয়াত একুশে পদক প্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কালিদাস কর্মকারের স্মৃতির প্রতি।

এর আগে বাংলাদেশের এশিয়ান বিয়েনাল, ইয়াং আর্ট এক্সিবিশন, ন্যাশানাল আর্ট এক্সিবিশন থেকে শুরু করে, চায়না প্রিন্ট বিয়েনালসহ ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্লাটফর্মে চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান এই চিত্রশিল্পী।।

এছাড়াও ২০১৯ সালে ভারতের ঊড়িষ্যার ‘EFAC (Eastern Foundation of Art & Culture), Odisha' আয়োজিত বার্ষিক প্রদর্শনীতে ছাপচিত্রে সেরা পুরস্কার অর্জন করেন। শিল্পের পথে হাঁটতে হাঁটতে শিখতে ও শেখাতে চান সুস্মিতা। কাজ করতে চান দেশীয় শিল্প নিয়ে। আর সেই কাজগুলোকে তুলে ধরতে চান বিশ্বের সামনে।