যেখানে সাগর মিশেছে সবুজে

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৪৪

সোলায়মান ডালিম

 

গ্রাম্য মেঠোপথ পেরিয়ে, ফসলি জমির সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও চারদিকে সবুজ আর সবুজ, মাথার ওপর বিশাল আকাশ, মাটিতে কেওড়া বন, খানিক দূরে সমুদ্রের বিশাল জলরাশি।—এ রূপ যেন হূদয় হরণীয়া। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতের এমন সৌন্দর্য বারবার টেনে নেয় পর্যটকদের।

সীতাকুণ্ড বাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গ্রামের মেঠোপথেও দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে যখন সৈকতের অদূরে বেড়ি বাঁধের ওপর দাঁড়াতেই চোখ পড়ে কেওড়া বনের ওপরের সীমাহীন আকাশের দিকে। আকাশের একই রূপ, ভয়াবহ ধরনের সৌন্দর্য আঁকড়ে ধরেছিল নিমিষেই। জুতো জোড়া হাতে নিয়ে কাঁদা মাটির ওপর দিয়ে কিছুটা পথ হাঁটার পর কানে ভেসে আসছিল সমুদ্রের গর্জন।

দেখতে কাছে মনে হলেও সৈকত তখনো প্রায় আধমাইল দূরে। সৈকতে যাওয়ার আগে কেওড়া বনে ঘাসের বিছানায় কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার পর সাগরের জলে পা ভেজাবো বলে সৈকতের দিকে গিয়ে দেখি দর্শনার্থীদের কোলাহল। দল বল নিয়ে কেউ ফুটবল খেলেছে, কেউ গাঁ ভেজাচ্ছে, অনেকেই আবার ছবি তুলতেই ব্যস্ত। শীতের বিকেলে প্রকৃতিতে হালকা কুয়াশার আবরণ।

বাংলাদেশের কক্সবাজার, কুয়াকাটা আর পতেঙ্গার মতো বেশ পরিচিত না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এ সৈকতে আনাগোনা বাড়ছে পর্যটকদের। সৈকতটির প্রকৃতির বৈচিত্র্যের অনিন্দ্য রূপই এর কারণ। কী নেই রূপসি এই সৈকতে।

একপাশে দিগন্ত বিস্তৃত সাগরের জলরাশি, আরেক পাশে কেওড়ার বন। বনের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট একটা খাল। খালের পাশে এদিক-ওদিক চারদিকে ছড়িয়ে আছে কেওড়ার শ্বাসমূল। সব মিলিয়ে একটা ম্যানগ্রোভ ম্যানগ্রোভ আবহ। অনেকেই এ অবহের সঙ্গে নিঝুম দ্বীপকেও মিলিয়ে ফেলেন। 

বিকেলের গুলিয়াখালি যতটা না সুন্দর তার চাইতে মনকাড়া রূপ সন্ধ্যার। একটু সন্ধ্যা হলে চারদিক থেকে শোনা যায় শিয়ালের ডাক। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। আর জোয়ার এলে জেলেদের ব্যস্ততা। এমন আবহ ছেড়ে কোনোভাবেই আসতে চায় না মন।

 

যেতে যত ভোগান্তি 

এমন আনিন্দ সুন্দর সৈকতটিতে যেতে দর্শনার্থীদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বাজার থেকে এ সৈকতটির দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। এ পথটাই ভোগান্তির কারণ। বিশেষ করে দুই ঈদ, পূজো, অন্যান্য ছুটি ও প্রতি শুক্রবারে এ রাস্তায় লেগে যায় যানজট। সরু রাস্তাটি দিয়ে একটির বেশি দুটো গাড়ি পারাপার হতে গেলেই তৈরি সমস্য। স্থানীয় এক মহিলা বলছিলেন, ‘কোন হতিনের পো ইয়ানের হবর দিছিল কে জানে, এখন আমগোর চিজ্জতের শেষ নাই।’

সরু রাস্তাটি কিছু অংশ ইট আর বিটুমিনের হলেও বেশিরভাগই মাটির। বর্ষায় এ রাস্তায় খানাখন্দ তৈরি হয়ে আটকে যায় গাড়ি।

 

নিরাপত্তার অভাব

এছাড়া রয়েছে নিরাপত্তার অভাবও। প্রতিদিন এ সৈকতে শতশত পর্যটকের আনাগোনা হলেও নেই কোনো ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও চোখে পড়ে না। এছাড়া সৈকতেও কোনো ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেই। যার কারণে এ সৈকতটিতে প্রাণ হারিয়েছে বেশ কয়েকজন যুবক।

এ ব্যাপারে কথা হয় সীতাকুণ্ডের উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম আল মামুনের সঙ্গে। তিনি জানান, গুলিয়াখালিকে সরকার এানো সৈকত হিসেবে ঘোষণা করেনি। যে কারণে সেখানে যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের অবকাঠামো তৈরি হয়নি। সরকার যদি সৈকত হিসেবে ঘোষণা করতো তাহলে রাস্তাঘাট, আবাসিক ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতো পর্যটন কর্পোরেশন। এখন এ বিচকে কেন্দ্র করে আলাদাভাবে কিছু করার সুযোগ নেই উপজেলা পরিষদের।

 

পর্যটকরা নষ্ট করছে পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য

এ সৈকতটি ঘুরে দেখা যায়, পর্যটকদের কারণে নষ্ট হচ্ছে এখানকার পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য। পর্যটকরা পানির বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ নানা ধরনের ময়লা আবর্জনা ফেলে নষ্ট করছে চারপাশের পরিবেশ। এছাড়াও সৈকত এলাকায় গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত দোকানপাঠ। এসব দোকানের কারণেও সৌন্দর্য হারাচ্ছে সৈকতটি।

 

থাকা ও খাওয়া

গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে থাকা-খাওয়ার কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। খেতে হলে সীতাকুণ্ড বাজারে যেতে হবে। বাজারে দেশীয় খাবার পাওয়া যায়। বাজারেই রয়েছে কয়েকটি থাকার হোটেল। এছাড়া কেউ যদি তাবু করে সৈকতে থাকতে চান তাহলে একা নয়, গ্রুপ করে থাকতে হবে। কেননা, এখানে নেই কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিজের নিরাপত্তা নিজেই তৈরি করে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

 

যেভাবে যাবেন

 

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণাড উপজেলায় গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত অবস্থিত। স্থানীয়রা গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতকে মুরাদপুর বিচ নামে চেনে। চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে উঠে নামতে হবে সীতাকুণ্ড বাজারে। সীতাকণ্ড থেকে সিএনজি, অটোরিকশা নিয়ে যেতে পারবেন গুলিয়াখালি সৈকতে। ভাড়া লাগবে ১শ’ ৫০ থেকে ২শ’ টাকা। আসার সময় গাড়ি নাও পেতে পারেন, তাই যাওয়া-আসার জন্য রিজার্ভ করে নিলেই ভালো হয়।