ট্রান্স ফ্যাট নামক মৃত্যুদূত নিয়ন্ত্রণ জরুরি

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪০

খাদ্য আমাদের প্রাণশক্তি জোগায়। কিন্তু মানুষের শরীরে যদি প্রতিনিয়ত অস্বাস্থ্যকর খাবার প্রবেশ করিতে থাকে, তাহা হইলে শরীর বিগড়াইয়া যাইতে বাধ্য। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসাবে ‘ট্রান্স ফ্যাট’ আজ বিশ্বব্যাপী মাথাব্যথার কারণ হইয়া উঠিয়াছে।

ট্রান্স ফ্যাট একপ্রকার হাইড্রোজেনেটেড অয়েল। উচ্চ তাপমাত্রায় দাহ্য তেল বা চর্বিও ট্রান্স ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়। শিঙাড়া, সমুচা, পুরি, বিস্কুট, চানাচুর, চিপসের মতো বেকারি পণ্য কড়া করিয়া ভাজা হয় বলিয়া সেইগুলিতে ট্রান্স ফ্যাট থাকে। রান্নার কাজে একই তেল বারবার ব্যবহার করিলেও তাহাতে ট্রান্স ফ্যাট উত্পাদিত হয়। পাম, সয়াবিন ইত্যাদি ভোজ্য তেলের সহিত হাইড্রোজেন যুক্ত (হাইড্রোজেনেশন) হইলে তেল জমিয়া যায় এবং ট্রান্স ফ্যাট উত্পন্ন হয়। ট্রান্স ফ্যাটের ব্যাপারে মার্কিন খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) প্রথম নড়িয়াচড়িয়া বসে ১৯৯৯ সালে। সেই সময় খাবারের মোড়কের গায়ে পুষ্টি তথ্যের সঙ্গে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণও উল্লেখ করিবার বিষয়টি প্রস্তাব করে এফডিএ, যাহা কার্যকর হয় ২০০৬ সালে। পরবর্তীকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুহার কমাইতে এফডিএ ‘ট্রান্স ফ্যাট’ নিষিদ্ধই করিয়া বসে। কারণ, ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার এতটাই বিপজ্জনক যে, ইহা রক্তে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বাড়াইয়া ‘ভালো’ কোলেস্টেরল কমাইয়া দেয়, যাহা হূদেরাগজনিত মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য প্রধান কারণ। ইহা ছাড়া ট্রান্স ফ্যাট টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, উচ্চমাত্রায় ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণে সার্বিকভাবে মৃত্যুঝুঁকি ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ—একজন ব্যক্তির দৈনিক ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ হওয়া উচিত মোট খাদ্যশক্তির ১ শতাংশের কম। ডেনমার্ক বিশ্বের প্রথম দেশ, যাহারা সেই ২০০৩ সালেই আইন করিয়া ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশ নির্ধারণ করিয়া দিয়াছিল। ইহার পর অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, ইরান, ভারতসহ ২৮টি দেশে খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করিয়া দেওয়া আছে। ইহা ছাড়া আরো ২৪টি দেশ খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করিয়াছে। এমনকি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা ও কানাডায় ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উত্স ‘পিএইচও’ উত্পাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। ফলে এই সকল দেশে খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের কারণে মৃত্যুর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাইয়াছে। দুঃখের বিষয় হইল, সম্প্রতি ঢাকার স্থানীয় বাজারে দৈবচয়নের মাধ্যমে সংগৃহীত ১২ ধরনের বেকারি বিস্কুট পরীক্ষা করিয়া তাহাতে ৫ হইতে ৩৯ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাটের উপস্থিতি দেখা গিয়াছে। কেবল তাহাই নহে, বাংলাদেশে শিল্পোত্পাদিত কোনো মোড়কজাত খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ করা হয় না।  

আমাদের দেশেও সময় আসিয়াছে ট্রান্স ফ্যাটের ব্যাপারে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণের। কোনো কোনো চিকিত্সক মনে করেন, দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন জরুরি। ইহার পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি। আমরা আশা করিব, সকল খাদ্যপণ্যে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ ২ শতাংশ বাঁধিয়া দেওয়ার পাশাপাশি ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উত্স ডালডা/বনস্পতি উত্পাদন, আমদানি, ব্যবহার নিষিদ্ধের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলি। জনস্বাস্থ্যের জন্য ইহা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।