বাংলাদেশ ও ভারত : সারাবিশ্বে সুপ্রতিবেশীর মডেল

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪১

ফারাজী আজমল হোসেন

২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ ভারত সফর ছিল দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্ককে আরো উন্নত করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর মধ্য দিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেকার আন্তরিক সম্পর্কের সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটেছে। কয়েকটি বিষয় এখনো  অমীমাংসিত থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চমত্কার সম্পর্ক বিদ্যমান, যা গড়ে উঠেছে গভীর ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ বন্ধনের ভিত্তিতে। এই সম্পর্ককে ভিত্তি করেই দুই দেশের এখন এগিয়ে যাওয়ার পালা।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব নিয়োগ দেওয়ায় আশা করা হচ্ছে  ঢাকা ও দিল্লির মধ্যেকার সম্পর্ক আরো উন্নত হবে। এর আগে ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে শ্রিংলা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐ সফরকালে সাতটি চুক্তি স্বাক্ষর এবং তিনটি প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। ফলে এটা পরিষ্কার যে দুই দেশের সম্পর্ক এক উচ্চ মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারত এখন সারাবিশ্বে সুপ্রতিবেশীর মডেলে পরিণত হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে—বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরায় গ্যাস সরবরাহ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি প্রদান। এছাড়া বাংলদেশি যুবক-যুবতিদের প্রশিক্ষণদানের জন্য একটি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চুক্তি দুই দেশের মধ্যে সুদৃঢ় বন্ধনেরই ফসল।

২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে প্রকাশিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিবৃতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা এবং প্রথাগত ও অপ্রথাগত ক্ষেত্রগুলিতে পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলির মধ্যে রয়েছে—সীমান্তে বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানির সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে তোলা, ব্যক্তি পর্যায়ে যাতায়াত এবং বাংলাদেশের আখাউড়া ও পশ্চিমবঙ্গের ঘোজাডাঙ্গা চেকপোস্ট দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থান সহজীকরণ, চরমপন্থি ও মৌলবাদী সংগঠন, সন্ত্রাসী, চোরাচালানি, জাল নোট পাচারকারী এবং  সংগঠিত অপরাধ সংগঠনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা, ব্যাপকভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি, সমন্বিত চেকপোস্টের বিষয়ে আলোচনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বৃদ্ধি, আখাউড়া-আগরতলা বন্দর দিয়ে বাণিজ্যে বিধিনিষেধ শিথিল, বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর ‘ডাম্পিং. ও ‘সারকামভেনশন’ বিরোধী শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা এবং সীমান্তহাটের সংখ্যা ১২টিতে উন্নীতকরণ।

অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ‘বিবিআইএন মোটর ভেহিকেলস’ চুক্তির মাধ্যমে সার্বিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং রেল, বাস ও বিমান যোগাযোগ জোরদার, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির রূপরেখা স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন, ত্রিপুরার সাবরুম শহরের বাসিন্দাদের পানীয় জলের চাহিদা পূরণে ফেনী নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের কাজ অবিলম্বে শুরু, প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন, জ্বালানি ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা সুসংহতকরণ এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বলপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে যৌথ প্রচেষ্টা চালানো।

দুই দেশের মধ্যে অপর উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো হচ্ছে—ভারত-বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ দেখতে গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কলকাতা সফর এবং দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। এছাড়া গত বছরের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অভিষেক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির অংশগ্রহণ। দুদেশের সামরিক বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকটি সফরও এ সময় অনুষ্ঠিত হয়।

গত বছর ভারত বাংলাদেশি আমলাদের প্রশিক্ষণদানে সম্মত হয়। অপরদিকে ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এলএনজি পাইপলাইনের জন্য ভারতীয় বিনিয়োগকে আমন্ত্রণ জানানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বেরিয়ে আসতে চলেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অব্যাহত অংশীদারিত্বে উভয় দেশ লাভবান হয়েছে। উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিকাশের স্বার্থে এই অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে শক্তিশালী পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্ব নিঃসন্দেহে সুফল বয়ে আনবে। এটা উল্লেখ করার বিষয় যে ভারত সরকার বাংলাদেশকে এই বলে আশ্বস্ত করেছে যে এনআরসি আইন কোনোভাবেই ঢাকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। তবে তিস্তার মতো সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমস্যা সমাধানে ঢাকার আহ্বানে দিল্লির সাড়া দেওয়া খুবই জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ বছর আগে ক্ষমতায় আসার পর তার পূর্বসূরিদের তুলনায় বিভিন্ন জটিল বিষয় অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পার্টিকে নিষিদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালে গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজনদের বিষয়ে তদন্ত ও বিচার পরিচালনার জন্য  তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ঐ গণহত্যায় ৩০ লাখ লোক প্রাণ হারান। যারা পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ছিল, শেখ হাসিনা তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। এছাড়া ২০১৬ সালে যেসব জঙ্গি ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়েছিল শেখ হাসিনা তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করেন।

এদিকে, ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত জেএমবিকে নির্মূলের প্রচেষ্টাও জোরদার করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ২০১০ সালে সংবিধানে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষাতাকে পুনর্বহাল করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্রসীমা নির্ধারণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল  এবং সীমান্ত সমস্যা সমাধানে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনোমোহন সিং এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং তাদের জন্য ভাসান চরে পাকা ভবন তৈরি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র শিলিগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের সংগে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই উদ্যোগ আঞ্চলিক সংযোগ নেটওয়ার্ককে আরো শক্তিশালী করবে। ‘থিমেটিক গ্রুপ অব রিজিওনাল কানেকটিভিটির উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারের সড়ক ও জনপথ বিভাগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ঐ বৈঠকে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক চালু করায় ঢাকা তার আগ্রহের কথা জানায়। কারণ বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল (বিবিআইএন) মোটর বেহিকেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এমভিএ) থেকে ভুটান সাময়িকভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় চুক্তিটি বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা-শিলিগুড়ি-গ্যাংটক (সিকিম)-ঢাকা এবং ঢাকা-শিলিগুড়ি-দার্জিলিং-ঢাকা বাস রুট চালু করার পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হলেও তা সরাসরি নয়। যাত্রীদের সীমান্তে বাস পরিবর্তন করতে হয়। নতুন নিয়মে যাত্রীদের সীমান্তে বাস বদল করতে হবে না। বিবিআইএন রাষ্ট্রগুলো চার সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যের অবাধ চলাচলের সুবিধার্থে ২০১৫ সালের ১৫ জুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী দেশগুলো অপর দেশের কনটেইনারবাহী ট্রাক ও ট্রেইলার এবং ব্যক্তিগত বা ভাড়ায় চালিত যাত্রীবাহী  যানকে তার ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেবে। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে গত বছর অনুষ্ঠিত জোটনিপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সংগে বৈঠক করেন। সেখানে তারা ভুটানকে বাদ দিয়ে একটি উন্মুক্ত সড়ক নেটওয়ার্ক প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে গত অক্টোবরে নয়াদিল্লি সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত মোটরযান চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করেন।

সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলকে অধিকতর সংযুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরকালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের শীর্ষ সম্মেলনের  সমাপনী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিগত দশকগুলোতে আমরা বেশ কয়েকটি চমত্কার আঞ্চলিক ধ্যানধারণা ও উদ্যোগ প্রত্যক্ষ করেছি। এর কয়েকটি অনুসৃত হয়েছে, বাকিগুলো ফলপ্রসূ হয়নি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা এখন আন্ত-দেশীয় গ্রিডের মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুত্ কিনছি। আমাদের জন্য এ ধরনের সহযোগিতামূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলা খুবই জরুরি।’

একই সময়ে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলইন প্রকল্পসংক্রান্ত এক বৈঠক অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এতে উভয় দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় এবং এর প্রতি বলিষ্ঠ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। বৈঠকে দুই দেশ এই প্রকল্পে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানে  সম্মত হয়। ৩৪৬ কোটি টাকার ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন একটি ঐতিহাসিক প্রকল্প। বাংলাদেশ অনুদান সহায়তার আওতায় ভারতের কাছ থেকে এই অর্থ পেতে যাচ্ছে। পাইপলাইনটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিলিগুঁড়িকে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরের সঙ্গে যুক্ত করবে। এই পাইপলাইন দিয়ে ভারতের নুমালিগড় তেল শোধনাগার থেকে বাংলাদেশে হাইস্পিড ডিজিল সরবরাহ করা হবে।

n লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক