দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
এক নিকটাত্মীয় অসুস্থ।
গত কয়েক দিন ধরেই ব্যাপারটা বাতাসে ভাসছিল। তিনি নিজেও নিশ্চয়ই কিছু অনুমান করতে পারছিলেন। এর মধ্যেই সেই অসুস্থ আত্মীয়র বাড়ি ছোটার পথে খবরটা পেলেন। কণ্ঠে অন্তত খুব একটা ভাবান্তর দেখালেন না। ফোন পেয়ে সবসময়ের মতো আন্তরিকভাবেই কথা বললেন। জানালেন, এই অবস্থায় ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে চান না। এই মুহূর্তে ক্রিকেট নিয়ে ভাবছেন না।
এই ভাবনার অজান্তেই কি তাহলে একটা পথের শেষে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ? টেস্ট ক্যারিয়ার কি তাহলে এখানেই শেষ হয়ে গেল!
জাতীয় দলের নির্বাচক কমিটি অবশ্য এই শেষের ইঙ্গিত দেওয়ার ধারেকাছেও গেল না। তারা এমনকি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে রিয়াদের না থাকাকে ‘বাদ পড়া’ বলতেও রাজি নয়। প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু বলছিলেন, তাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে।
নান্নু ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, ‘সে একজন সিনিয়র প্লেয়ার। আমরা ওকে এই সিরিজ থেকে বিশ্রাম দিয়েছি। হোম সয়েলে খেলা, তাই নতুন কিছু প্লেয়ারকে আমরা ট্রাই করি। একটা বা দুটা টেস্ট ম্যাচ খেলেছে এমন প্লেয়ার আছে। এই অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগানোর জন্যই এটা চিন্তা করেছি।’
কিন্তু বাজারের গুঞ্জনটা ঠিক নান্নুর এই কথাকে সমর্থন করে না। ক্রিকেটপাড়ায় গুঞ্জন, রিয়াদকে সাদা পোশাকের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এই কথাটাও কাল নান্নুর সামনে উঠেছিল। তিনি বলেছেন, কোচের সঙ্গে রিয়াদের বৈঠকে তিনি ছিলেন। এ রকম অবসরের কথা ওঠেনি সেখানে।
নান্নু যদি সত্যি কথাও বলে থাকেন, এইবার দল থেকে বাদ পড়ার পর টেস্ট দলে আবার নিজেকে খুঁজে পাওয়াটা রিয়াদের জন্য প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার হবে। ৩৪ পার করে ফেলা এই ব্যাটিং অলরাউন্ডারকে নতুন করে টেস্টের পরিকল্পনায় রাখা হবে, এমন আশা করাটা একটু শক্ত।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকে রিয়াদ কখনোই টেস্টের জন্য খুব উপযুক্ত বলে বিবেচিত হননি। সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও লম্বা সময় ধরে তার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের আশেপাশের সময়ে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে বিশেষ করে ব্যাট হাতে কার্যকর হয়ে ওঠেন। এই সময়ে রিয়াদের কিছু ম্যাচ শেষ করে আসার ঘটনা তাকে ‘ফিনিশার’ খেতাবও এনে দেয় সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু এই ২০১৮ সাল পর্যন্তও তার টেস্ট ক্যারিয়ার ছিল বিশাল একটা প্রশ্ন। বছরের পর বছর টেস্ট খেলে যাচ্ছেন, কিন্তু বলার মতো কোনো ইনিংস নেই। ২০০৯ সালে অভিষেকের পর ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারে একটিই মাত্র সেঞ্চুরি; সেটাও ২০১০ সালে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দেখা পান দ্বিতীয় সেঞ্চুরির। এখান থেকে ৪ টেস্টে ৩ সেঞ্চুরি করে হঠাত্ করে এই ফরম্যাটে নিজেকে আলোচনায় নিয়ে আসেন তিনি। কিন্তু সেই থেকে আবার রানখরায় ভুগছিলেন।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা সেই সিরিজের পর থেকে টেস্টে সর্বোচ্চ অপরাজিত ৩৯ রানের ইনিংস খেলতে পেরেছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে যেভাবে হ্যাটট্রিকের শিকার হয়েছেন, তা দৃষ্টিকটু ছিল।
সব মিলিয়ে বাদ পড়ার আগে ৪৯ টেস্ট খেলে ৩১.৭৭ গড়ে ২ হাজার ৭৬৪ রান করেছেন। বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাটসম্যানের তুলনায় খুব খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সামনে চলার পক্ষে এই পারফরম্যান্স যথেষ্ট কিনা, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। এটা নিশ্চিত যে, আবার টেস্ট দলে আসতে গেলে এই টি-টোয়েন্টি অধিনায়ককে লড়াই করেই আসতে হবে। এখন সেই লড়াইটা রিয়াদ করার অবস্থায় আছেন কি না, সেটাই বড়ো প্রশ্ন।
