দক্ষিণখানে দুই শিশুসহ মাকে হত্যা

গৃহকর্তা রকিবের খোঁজ মেলেনি চিরকুট ধরে চলছে তদন্ত

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:৩৭

রাজধানী ঢাকার দক্ষিণখানে মা ও দুই সন্তান খুনের ঘটনায় একটি চিরকুট ধরে চলছে তদন্ত; ঐ চিরকুট নিহত শিশু ?দুটির বাবার বলে পুলিশের দাবি। চিরকুটে নিজেকে ‘নিকৃষ্ট লোক’ উল্লেখকারী বিটিসিএলের উপসহকারী প্রকৌশলী রকিবউদ্দিনের কোনো সন্ধান গতকাল পর্যন্ত মেলেনি। তার ফোনটিও বন্ধ। রকিব তার স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে হত্যা করেছেন বলে পুলিশের ধারণা। তবে কী কারণে, তা এখনো জানা যায়নি।

দুই শিশুসন্তানসহ মায়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও খোঁজ মেলেনি গৃহকর্তা রকিবউদ্দিন ভূইয়া লিটনের। ম্যানুয়েল ও প্রযুক্তিগত তদন্তে তার অবস্থান শনাক্ত করতে থানার পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম ঘটনার ছায়া তদন্ত করছে। পুলিশের ধারণা, ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে হত্যার পর তিনি পালিয়ে গেছেন। তবে তাকে পাওয়া গেলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কে সি মডেল স্কুলের পেছনে প্রেমবাগান এলাকায় একটি বাড়ির পঞ্চম তলায় রকিবের বাসায় তার স্ত্রী মুন্নী বেগম (৩৭), তাদের ছেলে ফোরকান উদ্দিন (১২) ও মেয়ে লাইভার (৪) লাশ পাওয়া যায়। মুন্নীকে মাথায় ভারী বস্তুর আঘাতে এবং শিশু দুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে চিকিত্সকেরা জানিয়েছেন।

ডিএমপি উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) নাভিদ কামাল শৈবাল জানিয়েছেন, ‘আমরা সন্দেহ করছি, এ ঘটনার সঙ্গে রাকিব উদ্দিন ভূঁইয়া লিটন জড়িত। বাসা থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া একটি রক্তমাখা হাতুড়িও পাওয়া গেছে। তবে কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তার অনেক কিছুই ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। মূলত ঋণের চাপে হতাশা থেকে লিটন এ কাজ করেছেন বলে আমরা ধারণা করছি। বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরিতে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে লিটনের কী পরিমাণ ঋণ আছে তার উল্লেখ আছে।’

উত্তরখান থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সরোয়ার হোসেন খান জানিয়েছেন, তারা ঘরে একটি চিরকুট পেয়েছেন, তার সূত্র ধরেই চলছে তদন্ত। গত ১২ ফেব্রুয়ারি লেখা ঐ চিরকুটে নিজেকে ‘নিকৃষ্ট লোক’ হিসেবে তুলে ধরে দুই সন্তান ও স্ত্রী হত্যার কথা স্বীকারের পাশাপাশি আরো লেখা ছিল, তার লাশ রেললাইনে পাওয়া যাবে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে চিরকুটের হাতের লেখা রকিবউদ্দিনের। তবে এটা পরীক্ষার পর আরো নিশ্চিত হওয়া যাবে। শুক্রবার লাশ পাওয়া গেলেও হত্যাকাণ্ড বুধবার বিকালে ঘটেছে বলে পুলিশের ধারণা।

পুলিশ জানতে পেরেছে, রকিব বুধবার বিকালে তার এক সহকর্মীকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে বৃহস্পতিবার তিনি অফিসে যাবেন না। ফোনে কললিস্টের সূত্র ধরে সেই সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে তা জানা গেছে। তবে সেটাই ছিল তার ফোনে শেষ কথা বলা। এরপর থেকে ফোনটি বন্ধ বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেন খান।

বাড়ির মালিক মনোয়ার হোসেন জানান, ২০১১ সালের জানুয়ারিতে রকিব ভাড়ায় তার বাসায় ওঠেন। এত বছরে পারিবারিক বিবাদের কথা তিনি শোনেননি। তবে কিছুদিন আগে রকিব উদ্দিনের ঋণগ্রস্ততার কথা শোনেন তিনি। গত বুধবার দিনের বেলায় রকিবের সঙ্গে তার কথোপকথন হয়েছে বলেও জানান মনোয়ার।

ডিএমপির উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে প্রকৃত ঘটনা বের করার চেষ্টা করছি। রকিব উদ্দিনের খোঁজ পেলে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।

চিরকুটের সূত্র ধরে উত্তরখান থানা পুলিশ রেলওয়ে পুলিশকে বলেছে, ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত কিংবা আহত অজ্ঞাতনামা কোনো ব্যক্তির খবর পেলে তাদের জানাতে।

র্যাব-১ এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল জানান, রকিবকে সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেখা গেছে দক্ষিণখান এলাকায়। এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ। তার ফোনও বন্ধ। ঘটনার আলামত, পারিবারিক আত্মীয়স্বজনদের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে এটা স্পষ্ট যে, তিন জনই হত্যার শিকার। আমরা রকিবের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করছি।

রকিবের বিরুদ্ধে মামলা

এ হত্যার ঘটনায় রকিব উদ্দিন আহম্মেদকেই আসামি করে শনিবার রাতে দক্ষিণখান থানায় হত্যা মামলা করেছেন নিহত মুন্নির ভাই মুন্না রহমান। মামলার এজাহারে বলা হয়, রকিব উদ্দিন আহম্মেদ প্রায় ১ কোটি টাকার মতো ঋণ নিয়েছে। পাওনাদাররা টাকার জন্য তাকে খোঁজাখুঁজি করছে। তবে এই টাকার জন্যই দুই সন্তান ও স্ত্রীকে হত্যা করেছেন কি না, এ বিষয়ে এজাহারে কোনো কিছু বলেননি তিনি। তাহলে কেন তাকে এই মামলার আসামি করা হলো তা জানতে চাইলে মামলার বাদী মুন্না রহমান বলেন, ঋণের কারণে বিপদগ্রস্ত রকিব উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ কারণে তিনি আত্মীয়স্বজনদের কাছে টাকার জন্য ধরনা দিতেন। টাকা না দিলে তিনি স্ত্রী সন্তানদের হত্যা করে নিজে আত্মহত্যার হুমকি দিতেন। এ কারণে তাকেই হত্যার জন্য সন্দেহ করা হচ্ছে।

ডেমরায় চিকিত্সক খুনে গ্রেফতার নেই

ডেমরার মাতুয়াইল চিকিত্সক মোবারক হোসেনের খুনের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ঘটনার পর থেকে মুসলিমনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের পরিচালক জামাল হোসেন ও আক্তার হোসেন মামুন ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।

ডেমরা থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের বেশ কয়েকজন কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তাদের কাছ থেকে হত্যাসংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, শুক্রবার সকালে ডেমরার মাতুয়াইল মুসলিমনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের পরিচালক জামাল হোসেনের কক্ষ থেকে চিকিত্সক মোবারক হোসেনের (৩৩) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ডেমরা থানায় হত্যা মামলা হয়েছে।