ডিম পাহাড়ের পাদদেশে

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:১১

l  মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

 

প্রকৃতির রূপ দেখার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। ভ্রমণ করতে কাড়ি কাড়ি টাকার চেয়ে সুন্দর একটি ভ্রমণপিয়াসী মনই যথেষ্ট। যাক সেসব কথা। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের নিয়মিত ভ্রমণ আয়োজন হিসেবে এবার জোত্স্না বিলাসের জন্য গিয়েছিলাম আলীকদম উপজেলার মুরংদের বসতি আদুপাড়ায়। পূর্বপরিচিত মেন্থন মুরংয়ের ঘরে ঠাঁই নিয়েছিলাম। রফিক ভাইয়ের রান্না করা গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে ছুটলাম, পাড়া থেকে কিছুটা দূরে পাহাড় চূড়ায় গড়া মেন্থনের জুমঘরে। প্রথমে নেমে যেতে হলো অনেক নিচে। এরপর প্রবাহমান শ্বেত শুভ্র পানির ঝিরি মাড়িয়ে উপর দিকে উঠতে লাগলাম। জুমঘরটি চোখে পড়লে ভাবলাম এসেই গেছি। কিন্তু না যতই এগোই ততই যেন দূরে সরে যায়। সঙ্গী তুহিনের কথায় ভেবেছিলাম খুব সামান্য পথ। তাই লুঙ্গি পরেই ট্রেকিং নেমেছিলাম। কী আর করা! ওর বদৌলতে ‘লুঙ্গি ট্রেকিং’-এর অভিজ্ঞতা হলো। আর অভিজ্ঞতাটা মন্দ নয়!

জুমঘরে পৌঁছাতেই চক্ষু চড়কগাছ। মাতাল হাওয়ায় দেহ-মন জুড়িয়ে গেল। যত দূর চোখ যায় পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজ আর সবুজ। জুমঘরের অসাধারণ কিছু স্মৃতি নিয়ে পাড়ায় ফিরলাম। দিন শেষে নেমে এলো রাত। সঙ্গে করে যেন নিয়ে এলো চাঁদ। পূর্ণ চাঁদের আলোয় চারদিক ফকফকা। সুনসান পাহাড়গুলো যেন একেকটা হাই ভোল্টেজের সোডিয়াম আলোয় আলোকিত। জোত্স্নার আলো সঙ্গী করে হেঁটে বেড়ালাম। অনেক রাত পর্যন্ত মুলি বাঁশের মাচায় শুয়ে পূর্ণিমার আলো উপভোগ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টেরই পাইনি।  

পরের দিন সকাল সকাল ছুটলাম ডিম পাহাড়ের পাদদেশে। সতেরো কিলো নামক জায়গা থেকে চান্দের গাড়িতে চেপে বসলাম। গাড়ি এগিয়ে যেতে থাকল দেশের দ্বিতীয় উচ্চতম সড়কপথে। যতই এগিয়ে যায় ততই বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। এ পথে আমি আগেও এসেছিলাম। আগামীতেও আসব। এখানকার নজরকাড়া প্রকৃতিই ভ্রমণপিপাসুদের বারবার টেনে নিয়ে আসে। জনবসতিহীন রাস্তার ধারে চায়ের দোকান দেখে খানিকটা বিরতি নিলাম। একটা সময় দেখি পিছনে ফেলে আসা পথ শুভ্র ঘন মেঘে ঢেকে গেছে। চা চক্র শেষে আবার এগিয়ে চললাম। এবার চোখে ধরা দিল মিয়ানমারের মংডু শহরের সারি সারি পাহাড়। পুরো পাহাড়জুড়ে সবুজ। আমাদের পাহাড়গুলোতেও সবুজের সমারোহ কম নয়। প্রকৃতির কোমল নেশায় এবার গাড়ি ছেড়ে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে গেলাম একেবারে দিগন্ত ছোঁয়া ডিম পাহাড়ের পাদদেশে। মাথার উপরে নিলীমা, ডানে বামে সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। তারই মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে পাহাড়ের বুক চিরে করা থানচি যাওয়ার সড়ক। আমরা আর এগিয়ে না গিয়ে সেখানেই বসে পড়লাম। সেখানে বুক ভরা নিঃশ্বাস নিয়ে, অপলক চাহনিতে দূর বহু দূর—যত দূর যায় দৃষ্টির সীমানা তাকিয়ে রই। এই শীতেও ডিম পাহাড় লাগোয়া কুয়াশার চাদরে মোড়ানো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দোকান ঘরগুলোতে ধোঁয়া তোলা চায়ের কাপে চুমুক দিতে মন্দ লাগবে না কারো।

যাবেন কিভাবে       ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান হয়ে থানচি বা কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া নেমে আলীকদম হয়ে আদুপাড়া।

থাকবেন কোথায়    আদুপাড়াসহ আরও কিছু পাড়া রয়েছে। সেসব পাড়ার ঘরগুলোতে নামমাত্র খরচে থাকা-খাওয়া যায়।