পোশাকে ভাষার অহংকার

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৩৩

একুশে ফেব্রুয়ারি ধারণ করে আছে বাঙালি জাতির এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। শুধু তাই নয়, সেই ইতিহাসের কল্যাণেই একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হয়। বাংলাদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের যে ধারাবাহিকতার পুনর্বিন্যাস, পুননির্মাণ, অনুশীলন ইত্যাদি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পটভূমি প্রতিদিন প্রতিমাসে প্রতিবছর ক্রমশই আলোকিত হয়ে ওঠছে। লক্ষণীয় যে, এই ফেব্রুয়ারি মাসে পুরো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিপণন ও ঐতিহ্য বিকাশে দেশীয় ফ্যাশন হাউজ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ একুশের বিষয়বস্তুনির্ভর আমাদের চেতনা জাগানিয়া পোশাক-আশাক ও ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি করে যাচ্ছে। মূলত আমাদের জাতীয় চেতনায় পুনঃ পুনঃ বিকাশের তাগিদে। যা গত বছর ধরে জনসাধারণের পৃষ্ঠপোষকতায় ও মিডিয়ার সহযোগিতায় দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। সাদা ও কালো রঙের সমন্বয়ে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রেও থাকে ক্রেতাদের একটি বিয়োগাত্মক দিনের স্মরণগাথা। তাই বিয়োগ-ব্যথার বেদনার্ত রং কালোই মূলত সবক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। পোশাকে ও অন্যান্য সামগ্রীতে বর্ণমালা, শহীদ মিনার, একুশের পঙক্তিমালা, শহীদদের প্রতিকৃতিও থাকে বিভিন্ন ডিজাইন ও রঙে। এছাড়া থাকে বাঙালির চেতনাবাহী বিবিধ বিষয়; যা আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে। ভাষার প্রতি বাঙালির যে টান, যে মমত্ববোধ—এই টান ও মমত্ববোধ যেমন উত্কীর্ণ হয় লেখায়, রেখায় এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে; তেমনি ফ্যাশনের ভুবনেও একুশের মর্মার্থকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস থাকে প্রতিবছর, প্রতিনিয়ত গহীন ভালোবাসা দিয়ে। ভাষার মাস যখন বছর ঘুরে আবেগতাড়িত বাঙালির প্রাঙ্গণে এসে হাজির হয়, ঠিক তখন তার পাশে এসে দাঁড়ায় ঋতুরাজ বসন্ত। একদিকে শোকার্ত অতীতের শোকগাথার গল্পবুননের গুণগুলো বুকের স্পন্দনে তিরতির করে কাঁপতে থাকে। অন্যদিকে একইভাবে রঙিন বসন্তের ফাগুন হাওয়ার দোলায়ও দুলে ওঠে বাঙালির হূদয়। অনুভূতিতে জেগে ওঠে এক অন্যরকম আবেশ। একদিকে একুশের আবেগমথিত প্রহরের করুণ সুরেলা আবহ ‘রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির’ প্রাণাবেগকে করে তোলে বিধৃত আর বেদনাপ্লুত। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ফ্যাশন; তথা শিল্পের প্রতিটি শাখায় রয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির দারুণ প্রভাব। যে প্রভাবের স্পর্শে আলোকিত হয়ে ওঠেছে বাংলা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকসহ নানা অঙ্গন। সর্বোপরি প্রতিবছর বাংলা একাডেমি আয়োজন করে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বইমেলার। যে বইমেলা আজ প্রাণের মেলারূপে প্রতিটি বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি একুশের চেতনাকে ধারণ করে সাংস্কৃৃতিক অঙ্গনেও চলে নানা আয়োজন। একুশের চেতনার ধারা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃৃতির বুকে যে সুপ্রবাহের সৃষ্টি করেছে, তার ছোঁয়া লেগেছে দেশের ফ্যাশন ট্রেন্ডেও। বাঙালির পোশাক-ভাবনা বরাবরই বৈচিত্র্যপূর্ণ। আর সে ভাবনার গহীনে এখন চলছে দেশীয় মোটিফে করা আধুনিকবোধের প্রকাশ। বিভিন্ন উত্সবের পাশাপাশি নগরবাসী আজ একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে একুশের পোশাকের প্রতিও তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদানের মধ্যদিয়ে শহীদ দিবসের মর্মগাথাকে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে শরীরে জড়িয়ে নেয় গভীর ভালোবাসায়। দেশীয় ফেব্রিকে তৈরি একুশের পোশাক বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের আউটলেট থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হয় ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকে। রাজধানীর শতাধিক ফ্যাশন হাউস নাগরিক জীবনের পরম এই অনুষঙ্গকে অত্যন্ত নান্দনিকরূপে উপস্থাপনের লক্ষ্যে গ্রহণ করে বিপুল আয়োজন।

এই আয়োজনে থাকে পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, শাড়ি, থ্রিপিস, টি-শার্ট, পট, শোপিস, টিপট, মগসহ নানা সামগ্রী। বর্তমানের বয়ানে একুশের চেতনা ফুটিয়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে নানা গল্পের পটভূমি হয়ে থাকা টি-শার্ট। টি-শার্টের ছোট্ট এক চিলতে জমিনে যে কত আবেগ আর অনুভূতি এক হয়ে মিশে যেতে পারে, তা যেন সময়ের প্রতিটি পরতে পরতে একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে আমাদের সামনে। আর তাই একুশের চেতনাকে ধারণ করে থাকা টি-শার্টগুলোতে যেমন দেখা মেলে চিরাচরিত বর্ণমালার সুনিপুণ কোনো বিন্যাস, তেমনি এই সীমিত ক্যানভাসেই অপরিসীম আবেদন নিয়ে উঠে আসে দেশের প্রতি ভালোবাসার নানা গল্প। একটা সময় ছিল যখন, ফাল্গুন আর একুশের আয়োজনে মেয়েদের প্রথম পছন্দ ছিল শাড়ি। শাড়ির প্রতি সেই পক্ষপাত হয়তো এই সময়ের মেয়েদের মাঝেও কমবেশি বিদ্যমান। সাদা-কালো কিংবা নীলের পটভূমিতে একুশের বর্ণমালাকে ধারণ করা মেয়েদের শাড়িতে সুতির প্রাধান্যই বেশি। এছাড়া নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একুশের অন্যান্য যে অনুষঙ্গ যোগ হতে পারে পরিধেয়র সঙ্গে, তারমধ্যে প্রথমেই বলতে হয় মেয়েদের মাথা আর গলায় গাঁদা ফুলের সাজের কথা। একদিকে একুশের শহীদ বেদিতে গাঁদা কিংবা গোলাপের শ্রদ্ধার্ঘ আর অন্যদিকে একুশের চেতনায় শামিল হওয়া কোনো তরুণীর মাথায় শোভা পাওয়া গাঁদার মালা যেন একুশের ছন্দটাকেই নিয়ে আসে সকলের মাঝে। সেই সঙ্গে ছোট-বড় সকলের গালে রংতুলির ছোঁয়ায় জন্ম নেওয়া বর্ণমালা আর একুশের মিনারও যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, আজকের দিনটি শোককে শক্তিতে পরিণত করে ভাষার জন্য ভালোবাসা প্রকাশের দিন।

                 মডেল      গাজী মাজহারুল আনোয়ার

                        দিঠি আনোয়ার ও কবির বকুল

           মেকআপ      রিজভী

           পোশাক      বিশ্বরঙ

      কোরিওগ্রাফি      বিপ্লব সাহা

               ছবি      অনিক চন্দ্র