বাঙালির ইতিহাসে একুশ শুধু একটি তারিখ নয়; একুশ হলো একটি চেতনার বীজ। এই চেতনা থেকেই ৭১-এ আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। আবার গর্বের একুশ হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সাথে ভাষার এই মাস জুড়ে বইমেলার আয়োজনটিও হয়েছে উত্সবের। বাঙালি লেখক-পাঠকদের প্রাণের মিলনমেলা। পাশাপাশি একুশের চেতনা যোগ হয়েছে আমাদের ফ্যাশনে। তাই তো দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো প্রতিবছর নানা বৈচিত্যময় পোশাকে ক্রেতাদের জন্য তৈরি করে। সবমিলিয়ে একুশ এখন পরিণত হয়েছে লাইফস্টাইলে। এই লাইফস্টাইল বাঙালির ঐতিহ্যকে দিন দিন উজ্জ্বল করছে। জীবনযাপনে একুশ নিয়ে এবারের আয়োজন।
মেরিন আহমেদ
একুশ কেবল বাংলা ভাষার লড়াই ছিল না। একুশ ছিল বাঙালির সার্বিক মুক্তির সংগ্রাম। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার সেই লড়াইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল শিক্ষা, সমাজ ও অর্থনীতির লড়াইও। একুশ ছিল বাঙালির এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম। একুশে ফেব্রুয়ারি বর্তমানে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-পৃথিবীব্যাপী এ দিনটি পালিত হচ্ছে মাতৃভাষার চর্চা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার চেতনায়। একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে আমরা এক কৃত্রিম আবেগের সৌধ নির্মাণ করেছি। যার সঙ্গে জীবনযাপনের, বাস্তবতার যোগ সর্বত্র। জীবন এগিয়ে যাচ্ছে, জগত এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি। সেইসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির এক গৌরব উজ্জল ইতিহাস। তাই তো ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস হিসাবে বিশ্ববাসীর নিকট পরিচিত। এই মাসে চেতনায় এবং শ্রদ্ধায় অবনত হয় সমগ্র জাতি ও বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ এবং ভাষাপ্রেমীরা। বাংলাদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের যে ধারাবাহিকতার পুনর্বিন্যাস, পুননির্মাণ এবং অনুশীলন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার চলমানতা রয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পটভূমি প্রতিদিন প্রতিমাসে প্রতিবছর ক্রমশই আলোকিত হয়ে ওঠছে। লক্ষণীয় যে, এই ফেব্রুয়ারি মাসে পুরো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিপণন ও ঐতিহ্য বিকাশে দেশিয় ফ্যাশন হাউজ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ একুশের বিষয়বস্তু নির্ভর আমাদের চেতনা জাগানিয়া পোশাক-আশাক ও ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি করে যাচ্ছেন। প্রকৃতঅর্থে, আমাদের জাতীয় চেতনায় পুনঃ পুনঃ বিকাশের তাগিদে। যা বিগত বছরগুলোতে জনসাধারণের পৃষ্ঠপোষকতায় ও মিডিয়ার সহযোগীতায় দিন দিন সমৃদ্ধতর হচ্ছে। সাদা এবং কালো রঙের সমন্বয়ে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রেও থাকে ক্রেতাদের একটি বিয়োগাত্মক দিনের স্মরণগাথা। তাই বিয়োগ-ব্যথার বেদনার্ত রঙ কালোই মূলত সবক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। পোশাকে ও অন্যান্য সামগ্রীতে বর্ণমালা, শহীদ মিনার, একুশের পঙক্তিমালা, শহীদদের প্রতিকৃতিও থাকে বিভিন্ন সামগ্রী অবয়বজুড়ে। এ ছাড়া থাকে বাঙালির চেতনাবাহী বিবিধ বিষয়; যা আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে। ভাষার প্রতি বাঙালির যে টান যে মমত্ববোধ। এই টান ও মমত্ববোধ যেমন উত্কীর্ণ হয় লেখায়, রেখায় এবং দৈনন্দিন জীবন যাপনে তেমনি ফ্যাশনের ভুবনেও একুশের মর্মার্থকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস থাকে প্রতিবছর, প্রতিনিয়ত গহীন ভালোবাসায়। ভাষার মাস যখন বছর ঘুরে আবেগতাড়িত বাঙালির প্রাঙ্গণে এসে ছায়া ফেলে। ঠিক তার সঙ্গে এসে পাশে দাঁড়ায় ঋতুরাজ বসন্ত। একদিকে শোকার্ত অতীতের শোকগাথার গল্পবুননের গুণগুলো বুকের স্পন্দনে তিরতির করে কাঁপতে থাকে। একইভাবে রঙিন বসন্তের ফাগুন হাওয়ার দোলায়ও দুলে ওঠে বাঙালির হূদয়। অনুভূতিতে জেগে ওঠে এক অন্যরকম আবেশ। একদিকে একুশের আবেগমথিত প্রহরের করুণ সুরেলা আবহ ‘রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র প্রাণাবেগকে করে তোলে বিধৃত আর বেদনাপ্লুত। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ফ্যাশন তথা শিল্পের প্রতিটি শাখায় রয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির দারুণ প্রভাব। যে প্রভাবের স্পর্শে আলোকিত হয়ে ওঠেছে বাংলা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকসহ নানা অঙ্গন। সর্বোপরি প্রতিবছর বাংলা একাডেমি আয়োজন করে মাসব্যাপী বইমেলার। যে বইমেলা আজ বাঙালির প্রাণের মেলারূপে প্রতিটি বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি একুশের চেতনাকে ধারণ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও চলে নানা আয়োজন।
একুশের চেতনার ধারা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির বুকে যে সুপ্রবাহের সৃষ্টি করেছে সামপ্রতিককালে একুশের চেতনার ছোঁয়া লেগেছে দেশের ফ্যাশন ট্রেন্ডেও। বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে পোশাক একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যে অনুষঙ্গের গহীনে এখন চলছে দেশীয় মোটিফে করা আধুনিকবোধের প্রকাশ। বিভিন্ন উত্সবের পাশাপাশি নগরবাসীরা একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে পোশাকের প্রতিও তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদানের মধ্যদিয়ে শহীদ দিবসের মর্মগাথাকে প্রতিবছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীরে জড়িয়ে নেন গভীর ভালোবাসায়। দেশীয় ফেব্রিকে তৈরি একুশের পোশাক বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের আউটলেট থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হয় ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকে। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে এবং বাংলা ভাষার চেতনাকে পোশাকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে প্রতি বছর ফ্যাশন হাউজগুলোতে থাকে নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাকের সমারোহ। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভাষার মাসে পোশাকে অক্ষরচিত্র ও বিমূর্ত মোটিফ দিয়ে বৈচিত্র্যময় ডিজাইন করেছে। পোশাকের ক্যানভাসে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে স্ক্রিন ও ব্লক প্রিন্টের কাজ। সাদা-কালো-লাল কটন ফেব্রিক্সে সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ শিশু-কিশোরদের জন্য পোশাক থাকছে এবারের আয়োজনে। প্যাটার্ন ভেরিয়েশনে ট্রেন্ডি এবং ডিজাইনে অনুসরণ করা হয়েছে দেশীয় ঐতিহ্য। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও একুশের চেতনাকে পরিপূর্ণভাবে উদযাপন করার লক্ষেই এই বিশেষ আয়োজন। এই আয়োজনে থাকে পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, শাড়ি, থ্রিপিস, টি-শার্ট, পট, শোপিস, টিপট, মগসহ নানা সামগ্রী। বর্তমানের বয়ানে একুশের চেতনা ফুটিয়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠেছে নানা গল্পের পটভূমি হয়ে থাকা টি-শার্ট। টি-শার্টের ছোট্ট এক চিলতে জমিনে যে কত আবেগ আর অনুভূতি এক হয়ে মিশে যেতে পারে তা যেন সময়ের প্রতিটি পরতে পরতে একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে আমাদের সামনে। আর তাই একুশের চেতনাকে ধারণ করে থাকা টি-শার্টগুলোতে যেমন দেখা মেলে চিরাচরিত বর্ণমালার সুনিপুণ কোনো বিন্যাস, তেমনি এই সীমিত ক্যানভাসেই অপরিসীম আবেদন নিয়ে উঠে আসে দেশের প্রতি ভালোবাসার নানা গল্প। একটা সময় ছিল যখন, ফাল্গুন আর একুশের আয়োজনে মেয়েদের প্রথম পছন্দ ছিল শাড়ি। শাড়ির প্রতি সেই পক্ষপাত হয়ত এই সময়ের মেয়েদের মাঝেও কমবেশি বিদ্যমান। সাদা-কালো কিংবা নীলের পটভূমিতে একুশের বর্ণমালাকে ধারণ করা মেয়েদের শাড়িতে সুতির প্রাধান্যই বেশি। এ ছাড়া নারী-পরুষ নির্বিশেষে একুশের অন্যান্য যে অনুষঙ্গগুলো যোগ হতে পারে পরিধেয়র সঙ্গে তার মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় মেয়েদের মাথা আর গলায় গাঁদা ফুলের সাজের কথা। একদিকে একুশের শহীদ বেদীতে গাঁদা কিংবা গোলাপের শ্রদ্ধার্ঘ আর অন্যদিকে একুশের চেতনায় সামিল হওয়া কোনো তরুণীর মাথায় শোভা পাওয়া গাঁদার মালা যেন একুশের ছন্দটাকেই নিয়ে আসে সকলের মাঝে। সেই সাথে ছোট-বড় সকলের গালে রংতুলির ছোঁয়ায় জন্ম নেওয়া বর্ণমালা আর একুশের মিনারও যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। আজকের দিনটি শোককে শক্তিতে পরিণত করে ভাষার জন্য ভালোবাসা প্রকাশের দিন।
বইমেলা সামাজিক ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়। টিকেট ছাড়া এই মেলায় প্রবেশ করতে পারেন যে কোনো বইপ্রেমী। কেউ বই কিনতে আসেন, আবার কেউ ঘুরতে। সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের মিলন-মেলায় পরিণত হয় এই বইমেলা। এই মেলা লেখক এবং পাঠকদের দূরত্ব কমায়। প্রিয় লেখকদেরকে কাছ থেকে দেখতে পান ভক্তরা। তাদের অটোগ্রাফসহ বই কেনার সুযোগ হয়। এছাড়াও সাহিত্যপ্রেমীরাও একে-অপরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। অনেকসময় প্রতিবেশী দেশ থেকেও পাঠকরা আসেন। তাদের সঙ্গেও বন্ধন তৈরি হয়। বইমেলায় পরিবারের সবাই মিলে মিশে এলে শিশুদের মধ্যে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। তাদেরকে বয়স উপযোগী বই কিনে দিলে ধীরে ধীরে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয় তাদের মাঝে। যাদের বই পড়ার আগ্রহ নেই, বন্ধুদেরকে বই কিনতে দেখে তাদের মাঝেও বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। প্রতিবছরই বইমেলায় আসে নতুন লেখকের বই। বইমেলায় নিয়মিত যাদের যাতায়াত, তাদের অনেকেরই বই পড়ার পাশাপাশি লেখার প্রতিও আগ্রহ তৈরি হয়। তাছাড়া বইমেলায় প্রিয় লেখকদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগও পেয়ে যান অনেকে। ফলে নতুন লেখক তৈরি হয় এবং লেখকরা অনুপ্রেরণা পান। একুশের চেতনায় বাঙালি আপাদমস্তক নিজেকে সাজাতে চায় মাতৃভূমির রঙে-রূপে। যাতে ফুটে ওঠে তাদের রুচি, চেতনা ও ভালোবাসা। রক্তের দামে কেনা বর্ণমালার প্রতি বাঙালির অমর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানা রঙে-ঢঙে। তাই তো একুশকে বাঙালির লাইফস্টাইল বলা যায়।
মডেল কেয়া চৌধুরী
পোশাক কে ক্র্যাফট
ছবি তাহের মানিক
