রাজিয়া সুলতানা
মানুষের সদিচ্ছাই তার সব কর্ম প্রেরণার উত্স। যেটি তাকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করে; ভবিষত্ চলার পথকে সুগম করে। কোনো দেশের তরুণ সমাজরা সেই দেশের মূল চালিকা শক্তি। তারা অনেক ভালো কাজের মাধ্যমে দেশকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ভালো কাজ বা মানবিক কিছু করার জন্য কোনো বয়স বা খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় না। শুধু দরকার ইচ্ছাশক্তি, আগ্রহ আর উদ্যোগ। আজকে এমনি একটি স্ব-উদ্যোগের গল্প শুনব—
জায়নাব তানজীম এবং রিসা আহমেদ দুই জনেই ‘এ’ লেভেলের ছাত্রী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। ওরা ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ’সোলাস’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী ইয়ুথ সংগঠন গড়ে তোলে। এই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় দুস্থ মানুষের কল্যাণার্থে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, সাহায্য করে। ব্যক্তিগত এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কেও তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে। পড়ালেখা করা অবস্থায় এধরনের উদ্যোগ নেওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জায়নাব বলেন, আমাদের সমাজে অনেক অমিমাংসিত ইস্যু রয়েছে। যেগুলো একক কোনো ব্যক্তি বা সরকারের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়, তাই ছোটো ছোটো কিছু কল্যাণমূলক মাধমে মানুষকে সহায়তার হাত নিয়ে এগিয়ে আসা যেতে পারে। মূলত অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষদের সেবা করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই সংগঠনের পথচলা।
খুব স্বল্পসময়ে মাত্র চার মাসে এই সংগঠনটি সেবা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কয়েকটি কাজ করেছে। কখনো তারা বস্তির স্কুলে গিয়ে কিশোরীদের মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করে তাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতন করেছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও আলোচনা করেছে। আবার কখনো শীতে কষ্ট পাওয়া মানুষদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করে, বস্তিতে আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষদের খাবার দিয়ে সহায়তা করেছে। এবার প্রচণ্ড শীতের সময় রংপুরে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে কম্বল, সোয়েটার বিতরণ করেছে। আবার গত সপ্তাহে কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৫০০ ঘরবাড়ি পুড়ে অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনা শোনার পর ওরা এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে। ওদের কাজে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে। প্রায় ৪২ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে কড়াইল বস্তিতে আগুনে পুড়ে যাওয়া পরিবারগুলোকে ডাল, আলু ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করেছে। মজার বিষয় হলো যে, ওরা ফান্ড সংগ্রহ করে গুলশান-বনানীর বিভিন্ন অফিস থেকে, কখনো কোনো কোচিং সেন্টারের বা মসজিদের সামনে গিয়ে। আবার বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়েও টাকা সংগ্রহ করে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে বস্তিবাসী মানুষদের মধ্যে কাজ করার অনুভূতি সম্পর্কে জায়নাব বলে, দরিদ্র, অসহায় ও বিপণ্ন মানুষদের কল্যাণে সামান্য কিছু দিয়ে সাহায্য করতে পারার মধ্যে বিশাল আনন্দ আছে। বাস্তবে কাজ না করলে বোঝা যাবে না। এই ধরনের কাজে যেমন আনন্দ আছে, আবার বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। ফান্ড সংগ্রহ বা কাজ করতে গিয়েও অনেকেই বিষয়টি সহজভাবে নেয় না। তবে সাহস নিয়ে জায়নাব বলে, ভালো কাজ করতে গেলেতো বাঁধা আসবেই।
জায়নাব ও রিসা দুই জনেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। জায়নাব ‘এ’ লেভেল শেষ করে বায়োকেমেস্ট্রিতে কানাডায় গিয়ে পড়তে আগ্রহী। দুই বোনের মধ্যে তার বড়ো বোন কানাডার একটি নামকরা ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে সেখানেই কর্মরত। জায়নাবের বাবা ব্যবসায়ী ও মা গৃহিণী। আর রিসা সেও ব্যবসা প্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ব্যবসায়ী হতে চায়। ছোটো ছোটো বালুকণা মিলে যেমন একটি মহাদেশ গড়ে উঠে; তেমনি জায়নাব ও রিসাদের মতো ছোটো ছোটো ভালো কাজের উদ্যোগেও সমাজের কিছু মানুষেরা সামান্য হলেও উপকৃত হবে। ওদের এই উদ্যোগ সমাজের অন্যদের মধ্যে অনুকরণীয় হিসেবে কাজ করতে পারে।
