আলোর দিশারি ভাষাসৈনিক প্রতিভা মুত্সুদ্দি

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৩১

মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল

 

মিস প্রতিভা মুত্সুদ্দি। এক জন গুণী মানুষ। এক জন আলোর দিশারি নারী। নারী শিক্ষা, নারী আন্দোলন, নারীবান্ধব সমাজ গঠন তার চিন্তা আর চেতনা। নারীদের শিক্ষার জন্য তিনি সারাটা জীবন বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। সংসার ও পরিবার-পরিজন নিয়ে তার চিন্তা করার সময় নেই। বয়সের ভারে এখন ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন। তার পরও নারীদের শিক্ষার পথ থেকে সরে যাননি। তার এমন কর্মকাণ্ডে তিনি কুমুদিনী পরিবারের সব সদস্যের কাছে বড়ো মা হিসেবেই পরিচিত। ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী হাসপাতাল, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ, কুমুদিনী নার্সিং স্কুল ও কুমুদিনী বিএসসি নার্সিং কলেজ এবং কুমুদিনী পরিবারের প্রতিটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানই যেন তার তীর্থ স্থান। ৫২ ভাষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুথান, ৭০-এর নির্বাচন ও ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যে কয়েক জন নারী মুক্তির জন্য কাজ করেছেন তাদের এক জন হলেন প্রতিভাময়ী নারী ভাষাসৈনিক ও নানা গুণে গুণান্বিত প্রতিভা মুত্সুদ্দি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেলেও মানবসেবা, নারী মুক্তি, নারী আন্দোলন ও শিক্ষার উন্নয়নে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের মাতৃভাষার মুক্তির দিন। ভাষা সংগ্রামে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও অনেক। কিন্তু এখনো বাংলা ভাষার সর্বত্র প্রচলন না হওয়ায় কষ্ট পান ভাষাসৈনিকরা। তাদের মধ্যে এক জন প্রবীণ ভাষাসৈনিক একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রতিভা মুত্সুদ্দি। ১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে জন্ম নেন এ ভাষাসৈনিক। ছোটোবেলায় তার স্কুলজীবন শুরু হয় গ্রামের মহামুনী এ্যাংলো পালি ইনস্টিটিউশনস-এর মাধ্যমে। চট্টগ্রামের মেয়ে হলেও প্রতিভা মুত্সুদ্দি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মানুষের একান্ত আপনজন সবার ‘বড়ো মা’ হিসেবে পরিচিত।

গুণী এ ভাষা সৈনিকের সঙ্গে কথা হয় ৫২ ভাষা আন্দোলন ও দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে। তিনি বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীতি হয়ে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার যুদ্ধসহ সব আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলাম। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের কথা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৪৮ সালে গ্রামের স্কুলে থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন বক্তৃতা করছিলেন ‘উর্দু, উর্দু ও শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এ অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদে না, না, না, বলে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। চট্টগ্রামের কবি ও সাহিত্যিক ভাষাসৈনিক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটি গড়ে ওঠে। আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। সেই সময় যেসব জেঠাতো ভাই সব বামপন্থি ছাত্র রাজনীতি করত যার কারণে ভাষা আন্দোলনে ঝুঁকে পড়ি।

১৯৫১ সালে চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর স্কুল থেকে এসএসসি পাশের পর চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই। ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলাম। ভাষার দাবিতে আমি মাহবুবুল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেই। পোস্টার লিখি, অভিভাবকদের বাধাকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে নামি। চট্টগ্রাম রাষ্ট্রভাষা কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর আহ্বানে ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে ধর্মঘট পালন, মিছিল ও লালদীঘির ময়দানে সভায় অংশ নেই।

শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ২০০১ সালে একুশে পদক পান। একুশে পদক ছাড়াও ১৯৮৭ সালে বেইস এর আজিজুর রহমান পাটোয়ারী পদক, ১৯৯৫ সালে অনন্যা শীর্ষ দশ পদক, ১৯৯৬ সালে লায়ন নজরুল ইসলাম শিক্ষা স্বর্ণপদক, ১৯৯৮ সালে দ্যা রোটারি ফাউন্ডেশনে অব রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এর পল হ্যারিস ফেলো পদক, ২০০০ সালে বৌদ্ধ একাডেমি পুরস্কার এবং ২০০৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড মিশনের ধর্মবীর পদক ও ২০০৬ সালে বিশ্যুদানন্দ স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়েছেন এ মহীয়সী নারী ভাষাসৈনিক।

তিনি আরো বলেন,  দেশের সর্বক্ষেত্রে শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রচলন আরো ব্যাপকভাবে হওয়া উচিত। যুব সম্প্রদায় ছাড়া এ উন্নতি সম্ভব নয়। ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও দেশে অনেক জীবিত ও পরলোকগত ভাষাসৈনিকরা বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে অপরিচিত। তাদের পরিচিতির জন্য সরকারি ও বেসরকারি হস্তক্ষেপের একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।