মনীষী

‘ত্রৈমাসিকের মীজান সাহেব’

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:৪১

মশিউল আলম

 

মীজানুর রহমান বিরল প্রকৃতির সুলেখক ছিলেন। কিন্তু তাঁর নাম ও লেখার সঙ্গে পরিচয় আছে এমন মানুষের সংখ্যা বেশ অল্প বলে আমার ধারণা। এই অল্প সংখ্যক মানুষের কাছেও তাঁর পরিচয় যতটা লেখক হিসেবে, তার চেয়ে বেশি সম্পাদক হিসেবে। কেউ যখন তাঁর কথা উল্লেখ করেন, তখন তা করেন ‘ত্রৈমাসিকের সম্পাদক’ বলে। কেউ কেউ তাঁকে স্মরণ করেন ‘ত্রৈমাসিকের মীজান সাহেব’ হিসেবে। শিল্প-সাহিত্য, সংগীত ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ের যে পত্রিকাটি তিনি ঢাকা থেকে সম্পাদনা করতেন, তার নাম ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’।

পত্রিকাটি তাঁকে কিছু মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র করে তুলেছিল। কয়েকটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে দুই বাংলার লিটল ম্যাগাজিনের জগতে ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’ বিশিষ্টতা অর্জন করেছিল। তাঁর প্রিয় কজন ব্যক্তিকে নিয়ে তিনি মোটা মোটা কয়েকটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন। যেমন, কৃষ্ণদয়াল বসু সংখ্যা, কামরুল হাসান সংখ্যা, রশিদ চৌধুরী সংখ্যা, শামসুর রাহমান সংখ্যা, বিদ্যাসাগর সংখ্যা। একক বিষয়ভিত্তিক কয়েকটি বিশেষ সংখ্যাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। যেমন, বৃক্ষ সংখ্যা, পক্ষী সংখ্যা, বৃক্ষ ও পরিবেশ সংখ্যা, নদী সংখ্যা, দুই খণ্ডে  গণিত সংখ্যা।

শত শত পৃষ্ঠার একেকটি বিশেষ সংখ্যা তিনি সম্পাদনা করতেন সম্পূর্ণ একা। তাঁর কোনো সহকারী সম্পাদক ছিল না, প্রুফ রিডার ছিল না, অংকনশিল্পী-অঙ্গসজ্জাশিল্পী ছিল না। প্রচ্ছদপট বাদে পত্রিকার ভেতরের সব অলংকরণও তিনি নিজেই করতেন। আজীবন ভগ্নস্বাস্থ্য কিন্তু অক্লান্ত পরিশ্রমী এই মানুষটি যেটুকু লিখেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি লিখতে উত্সাহিত করেছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। নিজে লেখক হওয়ার ফুরসত পাননি, অন্যদের লেখক হওয়ার পথ সুগম ও প্রশস্ত করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদের দিয়ে লিখিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর অদম্য, অক্লান্ত তত্পরতার কথা তাঁর সমসাময়িক কালের লেখকেরা জানেন। লিখতে বসানো ও লেখা আদায় করার প্রক্রিয়ায় তিনি অনেক অলস লেখককে নানাভাবে ‘পীড়ন’ করেছেন। অনেকের অপটু, অপাঠ্য লেখা তিনি সম্পূর্ণ নতুন করে লিখেছেন।

একাই একটি পত্রিকা সম্পাদনার সব কাজ করা এবং সম্ভবত আরো নানা অজ্ঞাত কারণে তাঁর নিজের লেখার পরিমাণ বেশি নয়। কিংবা হয়তো তিনি নিজেই নিজের ভেতরের লেখকসত্তার পূর্ণ পরিচয় পাননি। ‘ত্রৈমাসিকের সম্পাদক’ হিসেবে তাঁর পরিচয় তাঁর লেখক পরিচয় ঢেকে দিয়েছে।  (অংশবিশেষ)

মীজানুর রহমান রচনাসমগ্র (মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৯)-এর

ভূমিকা থেকে