মনীষী

শিশুসাহিত্যিক ফয়েজ আহ্মদ

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২০

নজরুল ইসলাম নঈম

ফয়েজ আহ্মদ-এর জন্ম ১৯২৮ সালের ২ মে অবিভক্ত ভারতে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) বাসাইলভোগ গ্রামে। চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বাবার নাম গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, মায়ের নাম আরজুদা বানু।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘শিশু সওগাত’ পত্রিকায় একটি রচনা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর লেখালিখি শুরু।

কিশোর বয়সেই বিয়াল্লিশের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন ও তেতাল্লিশের মন্বন্তর তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কৈশোরেই তিনি বাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। কারারুদ্ধ অবস্থায় ১৯৬০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পান। আমৃত্যু পার্টির সদস্য ছিলেন। ২৫ মার্চের রাতে জাতীয় প্রেসক্লাবে পাকিস্তানি হামলায় আহত হয়েও সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যান এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে যোগ দেন। তিনি কলকাতা থেকে ফিরে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলের ওপর রিপোর্ট করতেন।

ফয়েজ আহ্মদ ১৯৪৮ সালে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, আজাদ ও পূর্বদেশের চিফ রিপোর্টার ছিলেন। সাপ্তাহিক ইনসাফ ও ইনসান পত্রিকায় রিপোর্টিং বিভাগে কাজ করেছেন। ১৯৫০ সালে ‘হুল্লোড়’ এবং ১৯৭১ সালে ‘স্বরাজ’ পত্রিকার সম্পাদক ও দৈনিক বঙ্গবার্তা-র প্রধান সম্পাদক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান সম্পাদক। তাঁর হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে পিকিং রেডিওর (বর্তমানে বেইজিং রেডিও) বাংলাভাষায় অনুষ্ঠান।

সামরিক শাসক আইয়ুব খানের আমলে তিনি ১৯৫৯ সাল থেকে চার বছর কারাবন্দি ছিলেন। বাংলাদেশেও তিনি সামরিক শাসক এরশাদের আমলে কারাবন্দি হন।

কর্ম ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ফয়েজ আহ্মদ প্রধানত শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর লেখা ছড়া নিয়ে ১০০টি আবৃত্তি ও সংগীতের ক্যাসেট বেরিয়েছে। তাঁর কবিতার অনুবাদগ্রন্থের নাম ‘দেশান্তরের কবিতা’। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। চার খণ্ডে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

ফয়েজ আহ্মদ একাধারে শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। ছড়াশিল্পী হিসেবে খ্যাতিমান। তিনি কখনোই কোনো কিছুতেই ভয় পেতেন না। জীবনে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ফয়েজ আহ্মদ মৃত্যুর আগে তাঁর চোখ সন্ধানীতে এবং দেহ বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজে দান করেন।

সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্য, রাজনীতি থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে ফয়েজ আহ্মদ এ দেশে তাঁর অবস্থান পুরোধাদের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলেন অসামান্য কর্মতত্পরতায়। ব্যক্তিগত সংসারের মায়া কাটানো এই চিরকুমার মানুষটি তাঁর কর্মপরিমণ্ডলে গড়ে তুলেছিলেন এক বিরাট পরিবার। সেই পরিবার ছেড়ে অমর একুশের ৬০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে ৮৪ বছর বয়সে ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান না-ফেরার দেশে।