একাদশ জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য যে নির্বাচনের ব্যবস্থা হয়েছে তা সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। যদিও তা অবাধ সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হবে কী না তা এখনো বলা সম্ভব নয়, কেননা রাষ্ট্রীয় কৃত্যকদের পরিকল্পিত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বে তা আরও বিঘ্নিত হবার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, কেননা দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা এবং অবিশ্বাসের মাত্রা যেমন উঁচু, ঠিক তেমনই শাসন-প্রশাসনের এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাষ্ট্রীয় কৃত্যকদের অধিকাংশকে মেধা, দক্ষতা এবং গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে যেভাবে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগদান করা হয়েছে এবং দেশে ক্ষমতার রাজনীতির আবহে যেভাবে তাদের পদায়ন ও পদোন্নতি দান করে দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত করা হচ্ছে তাতে দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা এবং অবিশ্বাসের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তা ছাড়া সংসদ না ভেঙে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সব দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয় না। সমান সুযোগ তৈরি হয় না সকল দলের সদস্যদের প্রতি রাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সমানভাবে সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য আচরণ না করলে। নির্বাচনের সময় কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলে এবং একই সময়ে কেউ কেউ দলীয় কাজকর্ম নীরবে করার সুযোগ পেলে সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা সম্ভব নয়। এসব দেখার জন্য নির্বাচন কমিশন রয়েছে বটে, কিন্তু এর পূর্বে কোনো একটি জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কোনো সময়ে কোনো নির্বাচন কমিশনকে দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায়নি। দক্ষতার সঙ্গে তাদের কাজ করতে দেখা যায়নি এ কারণে নয় যে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার স্বল্পতা রয়েছে, আসলে তাদের মধ্যে অভাব দেখা যায় সত্ সাহসের সদিচ্ছার অথবা নিরপেক্ষভাবে কাজ করলে সরকার যদি তা পছন্দ না করে এই আশঙ্কায়। হাজার বছরের পরাধীন জনসমাজ আর কতদিন সময় নেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে বলতে পারেন?
নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে এরই মধ্যে কিছু পক্ষপাতমূলক কাজের বিষয় বহু নাগরিকের নিকট প্রশ্নবোধক হয়ে দেখা দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের কার্যক্রম দেখাশোনার দায়িত্ব অথবা তাদের সম্পর্কে কোনোরূপ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব এসে পড়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর। সরকার তখন তেমন কিছুর জন্য আর দায়ী থাকে না। সরকারের নৈমিত্তিক দায়িত্ব পালন করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার পরে বিরোধী দলসমূহের পক্ষ থেকে হাজারো অভিযোগ এসেছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। বিনা কারণে নেতা-কর্মীদের বাড়িতে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অনেকেই নিজ বাড়িতে ঘুমাতে পারছেন না।
জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন। নির্বাচনকে অবাধ গ্রহণযোগ্য এবং প্রশ্নমুক্ত করতে হলে এই দুই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে দৃষ্টি দিতে হবে সব কিছুর আগে। দেশের সকল নির্বাচন বিশ্লেষক জানেন, এসব ক্ষেত্রে সরকার আগে থেকেই কৌশলগত অবস্থানে দলীয় কর্মকর্তাদের প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে রাখেন। নির্বাচন কমিশন এক পর্যায়ে পরিবর্তন আনলেও অন্য দুই পর্যায়ে সাজানো থাকবে সরকারের পরিকল্পিত অনুগতদের অবস্থান। তা হলে সেই তিন স্তরেই পরিকল্পিত সাজানো বাগানে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে এবং অনতিবিলম্বে। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন এদিকে কোনো দৃষ্টি দিয়েছে বলে মনে হয় না। এর কারণ কী? তারা কি সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ওখানে রয়েছেন? নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে, তারা যা করছেন তা কাচের ঘরে বসেই করছেন। তাই তাদের কাজকর্ম জাতীয় পর্যায়ে যেমন সুস্পষ্ট, আন্তর্জাতিক মহলেও তা দৃষ্টিগোচর। এবারের নির্বাচন যদি প্রত্যাশিত পর্যায়ের না হয় তা হলে তার দায়িত্ব বহন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। এখনো সময় আছে। সজাগ হোন। জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্বাচন কমিশন মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
দমন-পীড়নের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে গতিহীন করা সম্ভব। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে দমন-পীড়নের ফল হতে পারে জাতীয় স্বার্থের জন্য ভয়ঙ্কর প্রতিকূল। গণতন্ত্রের প্রতি এ দেশের জনগণের রয়েছে ভীষণ দুর্বলতা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ চায় বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার। উন্নয়নের বিকল্প শ্লোগানের মতো অর্থহীন কথাবার্তা গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের অনুরাগের মাত্রা বিন্দুমাত্র হ্রাস করবে না। গণতন্ত্রের মাধ্যমে জনগণ দেশে তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তাই বলি, মেয়র নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচন কিন্তু এক নয়, নির্বাচন কমিশনকে তা অনুধাবন করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে জনগণের সীমাহীন ত্যাগ তিতিক্ষার মাধ্যমে। সেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে তার জয়যাত্রা শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিজয় তিলকের আশীর্বাদ কপালে নিয়ে। এসব কারণে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন হোক। নির্বাচন হোক দৃষ্টান্তমূলক।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ এবং গ্রহণযোগ্য করার জন্য বাংলাদেশে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের, বিশেষ করে সর্বাপেক্ষা বৃহত্ বিরোধী দল বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যে সব মামলা সাজানো হয়েছে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এক হিসাবে দেখা যায়, গত পাঁচ/ছয় বছরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দেওয়া হয়েছে এবং এসব মামলায় সংশ্লিষ্ট রয়েছেন অগণিত নেতা-কর্মী। কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলাও রয়েছে। সার্বিক প্রয়োজনে এসব মামলা উঠিয়ে নেওয়া যায়। তা সম্ভব না হলে নির্বাচন পর্যন্ত ঐ সব মামলার অধিকাংশ স্থগিত রাখাও যেতে পারে। সকল দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হোক দৃষ্টান্তমূলক। এটি শুভবোধ সম্পন্ন সবার প্রত্যাশা। এ জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে সবার মিলিত প্রচেষ্টায়, খোলা মনে, উদারভাবে। এ জন্য সরকারকেই পালন করতে হবে মুখ্য ভূমিকা। নির্বাচনকালে সমতল ভূমি নির্মাণের দায় সরকারের। দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত হার-জিতের বিষয়টি এক্ষেত্রে মুখ্য নয়। মুখ্য হলো গণতন্ত্রের বিজয়ের বিষয়টি। দেশে গণতন্ত্র বিজয়ী হলে বাকি সবকিছু এমনিতেই সুন্দর ও স্বচ্ছ হবে। নির্বাচন সময়ে (নির্বাচনের দিন সাতেক পূর্ব এবং নির্বাচন শেষ হবার দিন চারেক পর পর্যন্ত) আমাদের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ও কর্মীদের উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে প্রচুর পরিমাণে সহায়তা করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
n লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
