মাহবুবা আহসান
বর্তমান সরকারের দক্ষ ও সুদৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশের অবস্থান স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক খাত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। অর্থনীতির সার্বিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কিছুটা সহনীয় মাত্রায় এনে এক অঙ্কের বাজারভিত্তিক সুদহার স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার অগ্রসরমান অর্থনীতিকে আরো বেগবান করতে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে অধিকতর সুসংহত করে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আর্থিক বাজারের শক্তিশালী অবকাঠামো উন্নয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের সক্ষমতার উন্নয়ন এবং উত্পাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) সহযোগিতায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্টিং প্রজেক্ট-এফএসএসপি’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির অনুমোদিত মেয়াদকাল ০১ জুলাই ২০১৫ হতে ৩১ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত। দেশের উত্পাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সমস্যা দূরীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণসহ এ প্রকল্পের আওতায় নানাবিধ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আর্থিক বাজারের অবকাঠামো শক্তিশালীকরণের লক্ষ্য হলো পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক পরিশোধব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ। ঋণ তথ্য ব্যুরোর সরবরাহকৃত তথ্যের মান বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র-ঋণ তথ্য অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে ঋণ তথ্য ব্যুরোর আওতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাঠামো শক্তিশালীকরণ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দেশের আর্থিক সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে উন্নততর আর্থিক বাজারের জন্য স্থিতিশীল এবং নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিতকরণ। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং, আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং নীতি ও পরিধি, ব্যাংকিং তথ্যাবলি, তথ্য-প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রভৃতি বিশেষায়িত ক্ষেত্রে সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রবিধি ও তত্ত্বাবধান সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণের জন্য প্রুডেন্সিয়াল রেগুলেশনগুলোকে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম রীতি-পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানসহ ব্যাসেল-৩ কাঠামো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতিমূলক নানাবিধ উদ্যোগ, ব্যাংকিং খাতে দক্ষতার সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলার লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত তত্ত্বাবধান পদ্ধতির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক তত্ত্বাবধান পদ্ধতি প্রবর্তন এবং এ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড কার্যকরভাবে সম্পন্নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত আর্থিক শিক্ষা কর্মসূচিতে প্রাথমিকভাবে গৃহীত উদ্যোগসমূহের মাধ্যমে প্রাপ্ত উপযোগিতা ও সুফলসমূহের বিশ্লেষণপূর্বক দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণে ভবিষ্যতে করণীয় কর্মপন্থা নির্ধারণপূর্বক প্রকল্পের আওতায় একটি বিশদ কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সে মোতাবেক আর্থিক শিক্ষা কর্মসূচির পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
দেশে একটি জনস্বার্থমুখী আধুনিক পেমেন্ট সিস্টেমস্ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমসের কৌশল এবং এর আইন ও প্রবিধিগত অবকাঠামো প্রণয়ন করেছে। এ আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক অটোমেশন ক্লিয়ারিং হাউস স্থাপন, এর সামগ্রিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালন, মোবাই ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস যথাযথ পরিবীক্ষণ (Oversight), ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ এর উন্নয়ন, ই-পেমেন্ট সিস্টেমস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ এবং ইলেকট্রিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) কার্যক্রম চালু করছে। এ দ্বারা বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স প্রবাহ ত্বরান্বিতকরণ এবং Real Time Gross Settlement (RTGS) বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। Alternative Payment Channels হিসাবে ব্যাংকিং খাতে মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে ২৯টি ব্যাংককে মোবাইল প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রদানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল যার মধ্যে একটি ব্যাংক কোম্পানির সাবসিডিয়ারিসহ ১৬টি ব্যাংক বর্তমানে এ সেবাটি দিচ্ছে।
মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪১টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা এপিজির (APG) প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের অবস্থান ও সরকারের অঙ্গীকার বিবেচনায় ২০১৮-২০২০ মেয়াদে বাংলাদেশ এপিজির (APG) কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিষয়ক তথ্য আদান প্রদানের প্রয়োজনে বিএফআইইউ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত সর্বমোট ৬৮টি দেশের এফআইইউ-এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। যার মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২টি দেশের এফআইইউ-এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ২৯ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গত ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ জারি করেছে। মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদারের লক্ষ্যে বিএফআইইউ বিভিন্ন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন—এপিজি, এগমন্ড গ্রুপ, এফএটিএফ ও বিমসটেকের মতো সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে নির্বাচিত ও প্রশিক্ষিত কিংবা স্ব-প্রশিক্ষিত নতুন উদ্যোগ গ্রহণে ইচ্ছুক উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজলভ্য করে আত্মকর্মসংস্থানে উত্সাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ‘কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল’ নামে ১.০০ বিলিয়ন টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (MRA) ভূমিকা অনস্বীকার্য। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি ও নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA) কর্তৃক ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ৮১৭টি ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী (MRA) প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিমা খাতের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা বিবেচনায় বিমা করপোরেশন আইনকে সময়োপযোগী করে ‘বীমা কর্পোরেশন আইন, ২০১৯’ জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। লাইফ ও নন-লাইফ মিলে ৭৮টি বিমা কোম্পানিকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি তাদের সেবা বিশ্বমানে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সবশেষে বলতে চাই, সেই দিন আর বেশি দূরে নেই। দৃঢ় অঙ্গীকার আর মনোবলের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন করে উন্নত দেশে নিজেদের অধিষ্ঠিত করা সম্ভব। সেখানেই হবে জয়ের সার্থকতা। ইনশাহ্আল্লাহ্।
n লেখক :ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার,
সোনালী ব্যাংক লিমিটেড
