অজয় দাশগুপ্ত
বড়দিন সিডনিতে যতটা ধর্মীয় উত্সব ততটাই সর্বজনীন আনন্দ উত্সব। দেশে যেমন ঈদ বা দুর্গা পূজা ঠিক তেমন। ধর্ম যার হোক আনন্দ সবার। সে আনন্দ কতটা ব্যাপক এদেশে না আসলে বোঝা সম্ভব হতো না। যে দেশে যে সম্প্রদায় সংখ্যাগুরু সেদেশে তাদের উত্সবের প্রভাব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। জন্মগতভাবে হিন্দু হবার পরও আমরা ঈদে সবচেয়ে বেশি আনন্দ করতাম। সকাল থেকে নতুন কাপড় পরে বেরিয়ে যেতাম। ফিরতাম রাতে। সে মজা বা আনন্দ ধর্মীয় উত্সবের বাইরে যে গতি দিত তার কারণেই আমাদের সমাজ আজো এতটা প্রগতি ধরে রেখেছে। সিডনির বড়দিন বা খ্রিষ্টমাস অনেকটা সে ধরনের। এখানে আমরা ঈদ বা পূজায় সাধারণ ছুটি কিংবা সরকারি কোনো বন্ধ পাই না। এমনিতেই ছুটি খুব কম। যা আছে তার ভেতর ধর্মীয় ছুটি মূলত দুটো। একটি বড়দিনের আর একটি ইস্টারের। দুটিতে মিলে বেশ ক’দিন ছুটির কারণে মানুষ সময় করে বেরিয়ে পড়ে। পরিবার পরিজন নিয়ে দূরে কোথাও চলে যায়। কাজপাগল আর কাজ করতে বাধ্য সমাজে মানুষের কাছে ছুটি সোনার হরিণ। গেল ক’বছর আমি নিজেও থেকেছি দেশের বাইরে। নানানদেশে ভ্রমণে যাবার এ এক চরম সময়।
বাণিজ্যিক দুনিয়ায় এখন যেকোনো উত্সব মানেই কেনাকাটা। মানুষকে কেনার জন্য পাগল করে তোলার কায়দা দিনকে দিন বাড়ছে। এখানে বড় বড় শপিং মলগুলো খ্রিষ্টমাস অবদি দিনরাত খোলা। রাত ন’ টা না বাজতে ঘুমে তলিয়ে যাওয়া কিংবা রাস্তাঘাটে মানুষহীন এক ভূতুড়ে শহর এখন পুরোরাত জমজমাট। অফিসে আদালতে উপহার বিনিময়ও অনেকটা বাধ্যতামূলক। বলা উচিত সৌজন্যমূলক। আপনাকে কেউ দেবে আর আপনি তাকে খালি হাতে ফেরাবেন এমনতো হতে পারে না। বাচ্চাদের সঙ্গে যারা কাজ করেন তাদের ঘর ভর্তি হয়ে যায় চকোলেট আর কেক কিংবা নানান উপহারের বাক্সে। দীপা স্কুলে কাজ করে। তাই আমাদের বাসার ড্রয়িংরুমের এক কোণায় একটা বাড়তি টেবিল বসানো হয় বড়দিনের আগে আগে। আস্তে আস্তে সে টেবিল ভর্তি হতে হতে উপচে পড়ে। তার ফাঁকে আমার ভাগ্যে জোটা এক বা দুইটা কার্ড আর ছোট দু’ একটা প্যাকেট সলজ্জতায় নিজেদের জায়গা করে নেয়।
অফিসে উপহার বিনিময়ের পাশাপাশি খাবারের প্রচলনও চমত্কার। এদেশে না আসলে জানতামই না পৃথিবীতে হেন কিছু নাই যা মানুষ খায় না। আমেরিকার মানুষ যা খায় না আফ্রিকার মানুষ তা আনন্দ করে খায়। উপমহাদেশের মানুষ যা খায় তা দেখলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ইউরোপের কেউ । আবার ল্যাতিন আমেরিকান বা ভিয়েতনামীর খাবার দেখে আপনার হয়ত সন্দেহ হতে পারে আসলেই কি মানুষ এসব খায়? বড় বিচিত্র এই জগত্। ঈশ্বর কতই না বিচিত্রমুখী। আর কত বৈচিত্র্যময় করে বানিয়েছেন মানুষ ও দুনিয়া!
বড়দিনের ধর্মীয় তাত্পর্য যাই হোক আমার কাছে যীশু নানা কারণে প্রিয়। অমন পেরেকবিদ্ধ প্রভু আমাকে বিগলিত করেন। মানুষের জন্য বা নিজের বোধের জন্য এতটা করুণ আত্মত্যাগ কাউকে মহিমান্বিত না করলে আর কিসে তা মহিমা লাভ করে? বাইবেলের অনুসারীরা আরো এক জায়গায় এগিয়ে। যখন ধর্ম ও বাস্তবতা কিংবা সভ্যতা মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছিল তারা নিউ টেষ্টামেন্টের মাধ্যমে নিজেদের চমত্কারভাবে বর্মের ভেতরে নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের দেশে বড়দিন ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। সরকারি ছুটিও থাকে সেদিন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে-শিল্পে-সাহিত্যে বড়দিনের প্রভাব আছে। আপনি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর একাত্তরের যীশু দেখলেই তা অনুধাবন করতে পারবেন। বাংলা সাহিত্যের একটি কিংবদন্তী কবিতা কলকাতার যীশু। যখনই আমরা সেটি পড়ি নতুন কোনো যীশুর আগমনের বার্তা শুনতে পাই বুকের ভেতর। কত বাঙালি মানুষের নাম যীশু। যাদের ধর্মীয় পরিচয় খ্রিষ্টান নয়। এভাবেই তার প্রভাব আমরা বরণ করে নিয়েছি। পোপ স্বয়ং এসেছিলেন আমাদের দেশে। সে প্রার্থনার ছবি দেখে মনে হয়েছে এমন একটি সর্বজনীন সমাজ ও দেশের জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তি নিকেতনে বড়দিনের জন্য গান নির্দিষ্ট করে রেখে গেছেন। একদিন যারা তাকে মেরেছিল এসে, এই গানটি গীত হয় সেদিনে। মোট দশটি লেখার ভেতর সাতটি প্রবন্ধ ও তিনটি কবিতা লেখেন ২৫ ডিসেম্বর। শেষ করব তাঁর বাণীটি দিয়ে: খ্রিষ্ট আজ জন্মেছিলেন। তিনি আজ আমাদের জীবনের মধ্যে জন্মগ্রহণ করুন। শুভ বড়দিন।
n লেখক :সিডনি প্রবাসী শিশুসাহিত্যিক
