ভাষার অর্থনীতি

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:১০

২০১৮ সালে ভাষা নিয়ে দুটি অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে একধরনের আবেগময় প্রতিবাদের মুখোমুখি হই। একটি অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল বায়ান্নর ভাষা সৈনিকদের সংবর্ধনা। অন্যটি বাংলা বইয়ের বিপণন নিয়ে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের তখন ৬৬ বছর পেরিয়ে গেছে। ভাষা সৈনিকদের বড়ো অংশই হয়তো যাঁরা বেঁচে আছেন কেউ চুরাশি-পঁচাশির নিচে নন। ভাষা সৈনিকদের প্রতি অশেষ সম্মান জানিয়েই আমি বলেছিলাম, আপনারা লড়াই করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করে দিয়েছেন, কিন্তু আমরা বাংলা ভাষায় মূল্য সংযোজন করতে পারিনি। বায়ান্নতে বাংলাভাষার যে আর্থিক গুরুত্ব ছিল, আমাদের হাতে তা এতটুকুও বাড়েনি, বরং কমেছে। ভাষায় আর্থিক গুরুত্ব না থাকলে সে ভাষা টিকিয়ে রাখা যায় না।

একজন সম্মানিত ভাষা সৈনিক আমার কথায় খুব ব্যথিত এবং রুষ্ট হলেন। বললেন, ভাষা কি আলু পটল নাকি যে এর মূল্য সংযোজন করতে হবে? আপনি এসব কী বাজে কথা বলছেন?

আমি তাঁর বায়ান্নর আন্দোলনকালীন আবেগ এবং বর্তমান বয়সের কথা বিবেচনা করে তাড়াতাড়ি ক্ষমা প্রার্থনা করি তবে মূল্য সংযোজন কথাটি প্রত্যাহার করিনি। বিপদাপন্ন ভাষাসমূহের পর্যালোচনা আমাকে ভাষার আর্থিক গুরুত্ব নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে।

বাংলা বই বিপণন, বইয়ের চাহিদা সৃষ্টি—এসব নিয়ে কথা বলার সময় আমি বিনয়ের সাথেই বলি, বাংলা ভাষায় এটা ওটা লিখে আহার ও বাসস্থানের ব্যয় অনেকটাই নির্বাহ করি, কাজেই বাংলা ভাষার প্রতি আমার ঋণের কোনো কমতি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলা একজায়গায় পৌঁছে স্থবির হয়ে গেছে। দ্বিতীয়  মহাযুদ্ধের সমাপ্তিকাল ১৯৪৫-কে বেঞ্চমার্ক ধরে হিসাব করে দেখুন, ইংরেজি ভাষার শব্দসংখ্যা কতগুলো বেড়েছে আর বাংলার কয়টা। আমি অনুবাদও করে থাকি, অনুবাদের সময় বাংলা ভাষার দৈন্য আমাকে কষ্ট দেয় এবং অনুবাদকর্মকে দুরূহ করে তোলে।

বাংলা ভাষার দীনতার যে কথা আমি বলেছি, একজন তরুণ লেখক ও সম্ভবত প্রকাশকও এর প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, পৃথিবীর তাবত্ ভাষাবিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন—বাংলা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা। সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা বাংলা।

আমি তুলনামূলক দীনতার বক্তব্য থেকে সরে আসিনি, তবে তাকেও বলেছি আমার ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ কথা যদি কাউকে আঘাত দিয়ে থাকে তাহলে আমি অবশ্যই ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু আমি জানি আমি এখানেও তেমন ভুল করিনি।

প্রায় সেঞ্চুরির নাগাল পাওয়া ভারতীয় সাহিত্যিক খুশবন্ত সিং (মাতৃভাষা পাঞ্জাবি, লেখালেখি করেছেন মূলত ইংরেজিতে) বাংলা ভাষাকে ভারতের ‘প্রভিন্সিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ বলে খানিকটা হেয় করে ভীষণ সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে অবাঞ্চিত ব্যক্তি ঘোষণার মতো পরিস্থিতি হয়ে যায়। তিনি নিজ মাতৃভাষা পাঞ্জাবিকেও ছাড় দেননি, এটিও প্রভিন্সিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ—প্রাদেশিক ভাষা। পাঞ্জবির ভবিষ্যত্ নিয়ে তিনি যে আশঙ্কিত সে কথাও বলেছেন।

পুশবন্ত সিং-এর কথাটি বাংলাদেশের বেলায় প্রযোজ্য নয়, কিন্তু ভারতের বেলায় অবশ্য সঠিক। ভারতের ২৮ রাজ্যে যে ভাষা সবচেয়ে বেশি পঠিত, তা ইংরেজি, দ্বিতীয় স্থানে হিন্দি। ভারতে সুশিক্ষিত মাত্রই ইংরেজিশিক্ষিত, মাতৃভাষার পাশাপাশি কিংবা মাতৃভাষা ভুলে অনেকে হিন্দি শিখেছেন, নিত্যকার কথাবার্তা কাজকর্ম, পড়াশোনা হিন্দিতেই সেরে নিচ্ছেন। এই তালিকায় বাঙালির সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু রবীন্দ্রসাহিত্য কিংবা বাঙালি মেয়ের কিংবা ছেলের প্রেমে পড়ে বাংলা শিখেছেন, আবু সয়ীদ আইয়ুব হবার দরকার নেই, অন্তত বাংলার কারণে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন—এই সংখ্যাটি নিতান্তই হাতেগোনা। সম্ভবত একালে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না—বাঙালি মেয়েটিকেই তার প্রেমিকের মাতৃভাষা রপ্ত করতে হয়েছে। 

ভাষার দৈন্য কিংবা সমৃদ্ধি দেখিয়ে দেবার অনেকগুলো সূচকের একটি হচ্ছে প্রমিত ভাষার অভিধানে শব্দসংখ্যা এবং ভাষার ব্যবহার-বৈচিত্র্য। ইংরেজি ভাষার অভিধানের পাশাপাশি বাংলা অভিধানের শব্দসংখ্যা অন্তত কিছুটা দৈন্যের সাম্য তো হবেই।

ইউনেস্কোর বিবেচনায় বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হলে এই ভাষার লেখক হিসেবে অবশ্যই আনন্দিত হই এবং অমিষ্ট ভাষা কিংবা তুলনামূলকভাবে কম মিষ্টি ভাষায় কথাবলা মানুষের চেয়ে উত্কৃষ্ঠ বচনধারী হিসেবে গর্ববোধও করি। কিন্তু আমি এটাও জানি—এই মিষ্টত্বের সৌরভ বাংলা ভাষাভাষীর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে দুটো মানুষের চাকরির সৃষ্টি করবে না এমনকি বাংলাদেশেও না। এই মিষ্টত্ব কেবলই গৌরবের।

কয়েকটি মিষ্টি ভাষার কথা বিবেচনা করা যাক। গত বছরে মিষ্টি ভাষা হিসেবে যে নামগুলো উঠে এসেছে, এরমধ্যে বাংলা ছাড়াও উচ্চারিত হয়েছে স্পেনিশ, ডাচ, ফিনিশ, চেক, ইতালিয়ান, আরবি। এই ভাষাগুলো সুন্দর, কোমল এবং মিষ্টি। সুমিষ্ট চেক ভাষার অবস্থা নড়বড়ে। অনেক বিদেশি চেক প্রজাতন্ত্রে বসবাস করছেন, তারা চেক ভাষার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না কারণ—

ক. ইউ এম ফরেন সার্ভিস ইনস্টিটিউট হিসাব করে দেখিয়েছে, চেক ভাষার পেশাগত পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করতে আনুমানিক ১১০০ ক্লাসরুম ঘণ্টার পাঠ নিতে হয়। প্রতি সপ্তাহে দুটি করে (২ ক্লাসরুম ঘণ্টা) লেসন নিলে চেক শিখতে ১১ বছর লেগে যাবে। সপ্তাহে ৫টি ক্লাস করলে লাগবে ছুটিবিহীন গড়ে চার বছর। কিন্তু জার্মান, স্পেনিশ কিংবা ডাচ ভাষায় এই দক্ষতা অর্জন করতে লাগে ৬০০ ক্লাসরুম ঘণ্টা।

খ. কর্মক্ষেত্রে অধিকাংশ অফিসে কাজের ভাষা ইংরেজি, কাজেই চেক লিখলেও চর্চার সুযোগ নেই।

গ. চেক টেলিভিশনে প্রদর্শিত অনুষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি, এতে চেক ভাষায় ডাবিং করা হয়, সাবটাইটেল দেওয়া হয় না। সাবটাইটেল বিদেশিদের দ্রুত শিখতে সাহায্য করে।

ঘ. চেক জনগণই ইংরেজি শেখার জন্য মুখিয়ে থাকে। কাজেই চেক এমনিতেই উপেক্ষিত হতে শুরু করেছে। চেক প্রজাতন্ত্রের বাইরে কোথাও চেক ভাষার ব্যবহার নেই।

ঙ. চেক ভাষার আর্থিক গুরুত্ব কম।

যত মিষ্টিই হোক কয়েক প্রজন্ম পর হয়তো চেকরাই নিজেদের ভাষা ব্যবহার করবে না।

ফিনল্যান্ডের ভাষা ফিনিশ মিষ্টি ভাষা হিসেবে বহুল স্বীকৃত। ফিনল্যান্ডের সরকারি ভাষা ফিনিশ, সুইডেনেও ফিনিশ মেজরিটি ল্যাঙ্গুয়েজ। ব্যালাড ও গানের ভাষা হিসেবে

এটাই সবচেয়ে জুতসই ভাষা বলে সংগীতজ্ঞরা মনে করেন। কিন্তু নিজ দেশে তারা সুইডিশ ভাষার খপ্পড়ে পড়েছেন। সুইডেনের সঙ্গে বাণিজ্যসম্পর্ক এই গ্রাসকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে ইংরেজি ও সুইডিশ দুই দিক থেকে মিষ্টি ভাষাটিকে খেয়ে ফেলছে। নেদারল্যান্ডের মিষ্টিভাষা ডাচ এমনিতে বিদেশি ভাষা বিশেষ করে ইংরেজি আত্তীকরণে সকল ভাষাকে ছাড়িয়ে গেছে। একটি-দুটি শব্দ নয়, গোটা বাক্যই আত্মস্থ করে ফেলে ডাচ। কেউ কেউ মনে করেছেন, আর ৪০০ বছরের মধ্যে ডাচদের নিজ দেশে তাদের ভাষাটি মাইনরিটি ল্যাঙ্গুয়েজে পরিণত হবে। ডাচদের প্রায় সকলেই এমনিতে দ্বিভাষী। পরিবারের ভেতরে ছাড়া তারা স্বচ্ছন্দে ডাচ ব্যবহার করেন না। ফ্রেঞ্চরা যেমন তাদের ভাষায় বিদেশিদের কথা বলতে বাধ্য করে, ডাচরা এর উল্টো, শিগগিরই বিদেশির ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। আরবি যে মিষ্টি ভাষা, উম্মে কুলসুমের গান তা জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই আরবি কোরানের ভাষা বটে, কিন্তু ধনী আরবি ভাষাভাষীদের সন্তানরা শৈশব থেকে থাকছে ইউরোপ-আমেরিকায় তাদের সেকেন্ড বা থার্ড হোমে। আববীয় ধনীর সন্তনারা মাতৃভাষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তাদের বৃহদাংশের প্রিয় ইংরেজি, দরিদ্র আরব অভিবাসী ঠাঁই পায় জার্মানিতে, তারা শিখেছে জার্মান। সাবেক ফ্রেঞ্চ কলোনির সন্তানরা শিখেছে ফ্রেঞ্চ। ইসরায়েলের এক পঞ্চমাংশ মানুষের মায়ের ভাষা আরবি, আরবির দাপ্তরিক মর্যাদাও আছে। কিন্তু আরব-বৈরিতার কারণে ইসরায়েলে দাবি উঠেছে—আরবির দাপ্তরিক মর্যাদা বাতিল করা হোক। ইসরায়েলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা দুর্বল সম্প্রদায়। তারা জানে তাদের প্রতিবাদ ধোপে টিকবে না। সব মিলিয়ে মিষ্টি ভাষা আরবি ভালো নেই। আমি বরাবরই আর্থিক যুক্তি দাঁড় করাতে চেষ্টা করি—ভাষার আর্থিক গুরুত্বই এর দীর্ঘমেয়াদের প্রাণশক্তি।

মনীষ নন্দী ২০১৭-এর অক্টোবরে বিলেতের গার্ডিয়ানে লিখলেন :বাংলা ভাষা ব্যবহার কমে যাচ্ছে, এই কমার হার আশঙ্কাজনক। তিনি ২০ বছর আগের কলকাতা ও ২০১৭-র কলকাতার উদাহরণ টানেন। মনীষ নন্দী নিজে বাংলা মাধ্যমে স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। কলকাতা বাণিজ্যনগরী। কেবলমাত্র দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ ছাড়া আর সবার ছেলেমেয়ে যাচ্ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে।

‘ভালো বাংলা জানা প্রার্থী চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন’—বাংলাদেশে প্রতিদিনের হাজার চাকরির বিজ্ঞাপনে এমন কথা কারো নজরে পড়েছে? পড়েনি। বাংলাদেশেই ‘হিন্দি জানা প্রার্থী অগ্রাধিকার পাবেন’—এমন চাকরির বিজ্ঞাপন আমার চোখে পড়েছে।

বাংলা নিয়ে আমাদের মৌসুমী হাকডাকই সার। বুদ্ধিজীবীদের সন্তাদের অধিকাংশই তাদের বইপত্রের নামও জানে না, তাদের নাতি-নাতনিদের অনেকে বাংলা পড়তেও পারে না। বাংলা যে পারে না—এটা তাদের দাদা-দাদি নানা-নানি গর্ব করে বলেও থাকেন। 

আমেরিকানদের রাষ্ট্রভাষা কী? অন্তত জার্মান তো নয়। বাঙালিদের রাষ্ট্রভাষা যেমন উর্দু হবার কথা নয়, হবার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণও নেই, আমেরিকানদের বেলায় জার্মান কিছুটা সে রকমই।

১৭৭৬-এ আমেরিকা যখন স্বাধীন হয়, অভিবাসী জার্মানদের মধ্য থেকে দাবি উঠে আসছিল, জার্মান হোক আমেরিকার সরকারি ভাষা। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এ বিল উত্থাপিত হয়েছে এবং পাশও হয়ে যেত যদি না জার্মান বংশোদ্ভূত স্পিকার বাধা হয়ে দাঁড়াতেন।

আমাদের বেলায় বাঙালি রাজনৈতিক এলিটরাই উর্দুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং এমনকি ১৯৪৭ উত্তর কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালি শিক্ষামন্ত্রী (সেই মন্ত্রী পরিষদে দুজন বাঙালি সদস্য ছিলেন, একজন ঢাকার একজন বরিশালের) আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগও নিতে চেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর প্রথম স্পিকার হিসেবে ফ্রেডরিক মুলেনবার্গকে বেছে নেওয়া হয়। তার বাবা হেনরি মুলেনবার্গের জন্ম জার্মানিতে। ফ্রেডরিকও জার্মানিতে পড়াশোনা করেছেন। তিনি দু’দফা স্পিকার ছিলেন। তার বিরোধী ভূমিকার কারণেই জার্মানকে সরকারি ভাষা করার বিলটি শেষ পর্যন্ত উত্থাপিত হতে পারেনি। ১৭৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সকল ফেডারেল আইন জার্মান ভাষায় প্রকাশের একটি প্রস্তাব মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে নাকচ হয়ে যায়।

জার্মান অভিবাসীদের ভাষাশিক্ষার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে ১৭৫৩ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেন, জার্মান অভিবাসীরা ইংরেজি শিখছে না; জার্মানদের মধ্যে যারা হীনবুদ্ধির কেবল তারাই বেশ ছেড়ে আমেরিকায় আসছে। থিওডোর রুজভেল্ট আমেরিকার জন্য কেবলমাত্র ইংরেজির কথা বলেন : আমাদের একটি পতাকা ও একটি ভাষা।

উর্দু যে বাঙালিদের জন্য নয়, অবাঙালি আগা খান ১৯৫১ সালেই লিখেছেন—ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সফর করেছি। কাউকে উর্দু বলতে শুনিনি।

আমাদের আলোচনায় যে চারটি ভাষা উঠে এসেছে—ইংলিশ, জার্মান, বাংলা ও উর্দু—এ ভাষাগুলোর বৈশ্বিক পরিস্থিতি কী?

ইংরেজি ইংল্যান্ড কিংবা আমেরিকার সীমান্ত পেরিয়ে ৫০টি দেশের একমাত্র কিংবা প্রধানতম সরকারি ভাষা। এই হিসেবে ভারতের মতো দেশকে বিবেচনা করা হয়নি। জার্মান ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সরকারি ভাষা। ১৮টি দেশে কমবেশি জার্মান চর্চা হয়। বাংলা কেবল বাংলাদেশেই; ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে সরকারি ভাষার মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করলেও ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে বাংলা ভাষার ব্যবহার, গুরুত্ব ও মর্যাদা দুইই কমছে।

বাংলা ভাষা নিয়ে আমরা যত অহংকারই করি না কেন—এটা প্রকাশ্যস্বীকৃত যে চাকরির বাজারে ইংরেজি জানা প্রার্থীরই অগ্রাধিকার।

সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা উর্দুর। পাকিস্তান এবং ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর এখনো উর্দু টিকিয়ে রেখেছে। বিহার, ঝাড়খণ্ড, তেলেঙ্গানা, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে উর্দু নিবু নিবু অবস্থায় বিরাজ করছে। ভারতের উর্দু মিডিয়াম স্কুলের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়েছে, বাকিগুলোও বিলুপ্তির পথে।

ভাষার বিকাশ ও বিলয়ের মূল কারণটি অর্থনৈতিক। যে ভাষা মানুষকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়, স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সে ভাষার দিকে ঝুঁকবে।

জনসংখ্যার বিচারে আংলা ষষ্ঠ অবস্থানে থাকলেও প্রযুক্তি, ইন্টারনেট ব্যবহারে শীর্ষ ৪০টি ভাষার মধ্যেও বাংলা ঠাঁই পায়নি। ফেব্রুয়ারিতে বাংলার জন্য মায়াকান্না বন্ধ রেখে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে প্রযুক্তির ভাষা, অর্থনীতির ভাষায় পরিণত করতে হবে। যতক্ষণ না বাংলাকে অর্থকরী ভাষা বলতে পারব—এ ভাষার সংকোচন ঠেকিয়ে রাখা কষ্টকর হবে।

 

লেখক :কথাসাহিত্যিক